হযরতওয়ালা মুফতী মনসূরুল হক সাহেব দা.বা এর লিখিত সকল কিতাব পাওয়ার জন্য ক্লিক করুন

হযরতওয়ালা দা.বা. এর কিতাব অনলাইনের মাধ্যমে কিনতে চাইলে ভিজিট করুনঃ www.maktabatunnoor.com

জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদরাসা থেকে প্রকাশিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার পেতে ক্লিক করুন

হযরতওয়ালা দা.বা. কর্তৃক সংকলিত চিরস্থায়ী ক্যালেন্ডার ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

হযরতওয়ালা শাইখুল হাদীস মুফতী মনসূরুল হক দা.বা. এর বয়ান এবং সমস্ত কিতাব, প্রবন্ধ, মালফুযাত একসাথে ১টি অ্যাপে পেতে ইসলামী যিন্দেগী অ্যাপটি আপনার মোবাইলে ইন্সটল করুন। Play Storeএবং  App Store

জামা‘আতে নফল নামায পড়ার বিধান

নফল নামাযের অর্থ আল্লাহ তা‘আলার সাথে একান্তে সাক্ষাৎ। এ জন্য শরীয়তে নফল নামায জামা‘আতে পড়া মাকরূহে তাহরীমী। চাই তা রমাযান মাসে হোক বা রমাযানের বাইরে হোক। ফুকাহায়ে কেরাম ও মুহাদ্দিসীনে ইযামের মাসলাক এ ব্যাপারে এমনই। সালাফে সালেহীনের ফাতাওয়া এবং তাদের আমলও এমন ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

তবে তারাবীহের নামায এর ব্যতিক্রম। তারাবীহের নামায জামা‘আতের সাথে আদায় করা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত। এটা খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত এবং চৌদ্দশত বছরের ধারাবাহিক আমল ও খিলাফে কিয়াস সাবেত। আর খিলাফে কিয়াস অর্থাৎ সাধারণ নিয়ম বহির্ভূত যে বিধান সাবেত হয় তা তার নিজস্ব পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ থাকে, অন্য বিধানকে তার উপর কিয়াস করা যায় না। তাই এমন বলা চলবে না যে, যেহেতু তারাবীহের নামায জামা‘আতের সাথে পড়ার বিধান, সুতরাং কেউ যদি তারাবীহ এর জামা‘আত শেষ হওয়ার পর পুনরায় নিজেরা তারাবীহ পড়তে চায় বা তাহাজ্জুদ নামায জামা‘আতে পড়তে চায় তাহলে জামা‘আতের সাথে পড়তে পারবে।

কেননা তাহাজ্জুদ তো সব সময়ের জন্যই নফল, আর দ্বিতীয় বারের তারাবীহও সাধারণ নফলে পরিণত হয়েছে, আর সাধারণ নফল নামায জামা‘আতে পড়া মাকরূহে তাহরীমী। যেমন বাদায়িউস সানায়ি’ ওয়ালা বলেন:

         اذاصلوا الترابيح ثم ارادوا ان يصلوابها ثانيا يصلى فرادى لابجماعة لان الثانية تطوع مطلق و التطوع المطلق بجماعة مكروه.   بدائع الصنائع২৯০/১

অর্থাৎ যদি লোকেরা তারাবীহর নামায পড়ার পর ২য় বার পড়ার ইচ্ছা করে তাহলে একাকী পড়বে, জামা‘আতে পড়বেনা। কেননা ২য় বারের তারাবীহ সাধারণ নফলের ন্যায়, আর সাধারণ নফল জামা‘আতে পড়া মাকরূহে তাহরীমী। (ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ১ম খণ্ড পৃ.১২৩, বাযযাযিয়া ৪র্থ খণ্ড ৩১পৃ.)

আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) বলেন, জামা‘আতের সাথে নফল পড়া মুস্তাহাব নয়। কারণ সাহাবায়ে কেরাম রমাযানের তারাবীহ ছাড়া এমন করেননি। (শামী ১ম খণ্ড পৃ.৬৬৪)

মুহাক্কিক ইবনুল হুমাম রহ. বলেন, কাফী কিতাবের সূর্যগ্রহণের নামায অধ্যায়ে হাকেম শহীদ রহ. ও স্পষ্ট করেছেন, যে তারাবীহ ও সূর্যগ্রহণের নামায ছাড়া অন্যান্য নফল নামায জামা‘আতের সাথে পড়া মাকরূহ। (ফাতহুল কাদীর ১ম খণ্ড পৃ. ৪৩৮)

এছাড়া বিবেকের দাবি এটাই যে, নফল নামায একাকী পড়া হবে। কারণ নফল ইবাদতের মধ্যে গোপনীয়তা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ উদ্দেশ্যেই বলেছেন:   صلوة المرء في بيته افضل من صلوته في مسجدي هذا الا المكتوبة

অর্থ: কোন ব্যক্তির নফল নামায তার ঘরে পড়া আমার এই মসজিদে (নববী) পড়ার চেয়ে উত্তম, তবে ফরয নামাযের কথা ভিন্ন অর্থাৎ ফরয মসজিদে পড়া জরুরী। (আবূ দাঊদ শরীফ হা. নং ১০৪৪) অন্য হাদীসে আছে:   أفضل صلاة الرجل صلاته فى بيته الا المكتوبة – অর্থাৎ ফরয নামায ব্যতীত পুরুষের শ্রেষ্ঠ নামায হলো তার ঘরের নফল নামায । (তাবারানী ৫/১৬০)

শুধু ফরয নামাযকে অন্য সকল নামায থেকে পৃথক করার  দাবি হলো তারাবীহের নামাযও অন্যান্য নফলের ন্যায় বাড়িতে একাকী পড়া উত্তম। তবে তারাবীহের নামায সাধারণ নফলের হুকুম থেকে ব্যতিক্রম। কেননা তারাবীহের জামা‘আত নবী আলাইহিস সালাম ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণিত।

উপরের আলোচনা দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয় যে, নফল নামায একা পড়তে হয়, জামা‘আত বদ্ধ হয়ে নয়। যদি জামা‘আত করার অনুমতি থাকত তাহলে সাহাবায়ে কেরাম ও পরবর্তী যুগের উলামায়ে কেরাম নফল নামাযের জামা‘আত করা থেকে বিরত থাকতেন না।

এরপরও কোন কোন আলেম শুধুমাত্র রমাযান মাসের তাহাজ্জুদের জামা‘আতকে বৈধ বলতে চান। তারা দলীল হিসাবে হাদীসের ব্যাখ্যা গ্রন্থ ও ফিকহের কিতাবের ঐ সমস্ত বর্ণনা পেশ করেন যার মধ্যে তারাবীহকে বুঝানোর জন্য কিয়ামে রমাযান শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এক্ষেত্রে তারা বলেন, কিয়ামে রমাযান যে নামাযের মাধ্যমেই হাসিল হবে এখানে সেই নামাযই উদ্দেশ্য। আর তাহাজ্জুদ দ্বারাও কিয়ামে রমাযান হাসিল হয়। আর কিয়ামে রামাযানে জামা‘আত জায়িয হওয়ার ব্যাপারে যেহেতু সকল উলামায়ে কেরাম একমত, তাই রমাযান মাসে তাহাজ্জুদের মধ্যেও জামা‘আত জায়িয।

কিন্তু বাস্তবতা হলো কিয়ামে রমাযান আক্ষরিক অর্থে যদিও ব্যাপক তবে ফুকাহা ও মুহাদ্দিসীনদের পরিভাষা হলো তারা কিয়ামে রমাযানকে শুধু তারাবীহর সাথে নির্দিষ্ট করে থাকেন। তবে তারাবীহ না লিখে কিয়ামে রমাযান কেন লিখেন সে ব্যাপারে আল্লামা আকমালুদ্দীন বাবারতী রহ. বলেন ‘তারাবীহের নামায এর বয়ানের জন্য কিয়ামে রামাযান দ্বারা শিরোনাম করা হয় হাদীসের শব্দের অনুকরণের উদ্দেশ্যে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের উপর রোযা ফরয করেছেন আর আমি তোমাদের জন্য কিয়ামে রমাযানকে সুন্নাত করেছি। (ইনায়া আলা হামিশিল ফাতহিল কদীর ১/৩৩৩)

এছাড়া ফুকাহায়ে কেরামের ইবারত দেখলে বুঝা যায় যে, তারা কিয়ামে রামাযান দ্বারা তারাবীহই উদ্দেশ্য নিয়েছেন তাহাজ্জুদ নয়। যেমন: হিদায়ার গ্রন্থকার রহ. فصل في التراويح এর স্থলে فصل في قيام رمضان এর শিরোনাম লাগিয়ে তারাবীহর নামাযের আলোচনা শুরু করেছেন। হিদায়ার ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোতেও এমনটি করা হয়েছে। যেমন: ফাতহুল কদীরে মুহাক্কীক ইবনুল হুমাম রহ. কিয়ামে রমাযান শিরোনামে তাহাজ্জুদ এর পরিবর্তে তারাবীহ শব্দের ব্যাখ্যা শুরু করেছেন। যেমন: فصل في قيام رمضان. التراويح جمع ترويحة….  (ফাতহুল কদীর ১ম খণ্ড পৃ.৩৩৩)

‘ইনায়া’গ্রন্থে আল্লামা আকমালুদ্দীন বাবারতী রহ. কিয়ামে রমাযান শিরোনাম দিয়ে তারাবীহকে সুনান এবং নাওয়াফেল থেকে আলাদা করার কারণ বর্ণনা করা শুরু করেছেন।

শামসুল আইম্মা সারাখসী রহ. তারাবীহর নিয়তের ব্যাপারে বলেন, সঠিক কথা হলো তারাবীহর নিয়ত করবে অথবা কিয়ামুল্লাইলের নিয়ত করবে। (মাবসূত লিস্সারাখসী ২য় খণ্ড পৃ. ১৪৫)

ফাতাওয়ায়ে কাযীখানে আছে.“যদি তারাবীহ অথবা সুন্নাতে ওয়াক্ত বা রমাযানের কিয়ামুল্লাইলের নিয়ত করে তাহলেও জায়িয আছে। (১ম খণ্ড পৃ ২১৬)

এসব ইবারত দ্বারা বুঝা যায় যে, কিয়ামুল্লাইল ও তারাবীহ এক ও অভিন্ন বিষয় যার কারণে তারাবীহের ক্ষেত্রে কিয়ামুল্লাইল বলে নিয়ত করলে ও তারাবীহ হয়ে যাবে। এমনি ভাবে আল্লামা আনওয়ারশাহ কাশ্মিরী রহ. তিরমিযী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ العرف الشذي  এর মধ্যেقيام شهر رمضان এর তাফসীর করেছেন তারাবীহ দ্বারা। (১ম খণ্ড পৃ.৩২৯)

আল্লামা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ. আরো স্পষ্ট করে বলেছেন:

باب في قيام شهر رمضان هذا القيام كان عاما ثم اختص بالتراويح فمطلقه يراد به التراويح. (الكوكب الدري٢٦٧ঃ١)

অর্থাৎ কিয়ামে রমযান বিষয়টি আগে ব্যাপক ছিল পরে তারাবীহর সাথে খাছ হয়ে গেছে। সুতরাং এখন সাধারণভাবে “কিয়ামে রামাযান” বললে তারাবীহই উদ্দেশ্য হবে। (আল কাউকাবুদ্দুররী ১ম খণ্ড পৃ.২৬৭)

এছাড়াও তাহাজ্জুদের জামা‘আতকারীরা মুআত্তা ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর এই ইবারত দ্বারা দলীল পেশ করে থাকেন-

قال محمد رحمة الله عليهঃ ولهذا كله نأخذ لا باس بالصلوة في شهر رمضان ان يصلي الناس تطوعا بامام لان المسلمون قد اجمعوا علي ذلك

অর্থাৎ ‘রামাযান মাসে ইমামের পিছনে নফল পড়তে কোন অসুবিধা নাই কেননা এ ব্যাপারে মুসলমানদের ইজমা রয়েছে, এর জবাবে আমরা বলবো, তারা যে ইবারতকে নফলের জামা‘আত জায়িয হওয়ার দলীল মনে করেছেন এটা আসলে তাদের বিপথের অর্থাৎ জায়িয না হওয়ার দলীল আর সে দলীল মুসলমানদের ইজমা। কারণ তারাবীহ ছাড়া অন্য কোন নফল নামাযের জামা‘আতের উপর ইজমা তো  দূরের কথা মূল জামা‘আতই খাইরুল কুরূনে সাবেত নেই।

উপরের আলোচনা দ্বারা আমাদের কাছে একথা স্পষ্ট হয় যে, নফলের জামা‘আত কোন ক্রমেই বৈধ নয়। চাই রামাযান মাসে হোক বা রামাযানের বাইরে হোক। সুতরাং আমাদের কর্তব্য হলো, কোথাও এধরণের জামা‘আত হতে দেখলে তাদেরকে হেকমতের সাথে বুঝিয়ে এই মাকরুহে তাহরীমী কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে তাওফীক দান করুন। আমীন।