হযরতওয়ালা মুফতী মনসূরুল হক সাহেব দা.বা এর লিখিত সকল কিতাব পাওয়ার জন্য ক্লিক করুন

হযরতওয়ালা দা.বা. এর কিতাব অনলাইনের মাধ্যমে কিনতে চাইলে ভিজিট করুনঃ www.maktabatunnoor.com

জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদরাসা থেকে প্রকাশিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার পেতে ক্লিক করুন

হযরতওয়ালা দা.বা. কর্তৃক সংকলিত চিরস্থায়ী ক্যালেন্ডার ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

হযরতওয়ালা শাইখুল হাদীস মুফতী মনসূরুল হক দা.বা. এর বয়ান এবং সমস্ত কিতাব, প্রবন্ধ, মালফুযাত একসাথে ১টি অ্যাপে পেতে ইসলামী যিন্দেগী অ্যাপটি আপনার মোবাইলে ইন্সটল করুন। Play Storeএবং  App Store

প্রচলিত আযানের শরয়ী বিধান

বর্তমানে আমাদের দেশে অধিকাংশ মসজিদে লক্ষ্য করা যায় যে, আযানের মধ্যে মাদ্দের (টানের) ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করা হয়। তাজবীদের কায়েদা অনুসরণ না করেই যেখানে এক আলিফ থেকে বেশি টানা নিষেধ সেখানে তিন চার আলিফ পর্যন্ত টানা হয়। আর যেখানে শেষে তিন আলিফ মাদ্দ আছে সেখানে মুআয্যিনের দম শেষ না হওয়া পর্যন্ত টানতে থাকে। অথচ নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহে এই তরীকার আযানকে নিকৃষ্ট বিদ‘আত ও মাকরূহে তাহরীমী পর্যন্ত বলা হয়েছে। এবং এই ধরণের আযানদাতাকে জাহিল আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ সম্পর্কে নিম্নে নির্ভরযোগ্য কয়েকটি কিতাবের উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হলোঃ

 ১.وحده مقدار الف وصلا و وقفا ونقصه عن الف حرام شرعا فيعاقب على فعله ويثاب على تركه فما يفعله بعض ائمة المساجد واكثر المؤذنين من الزيادة فى المد الطبعى عن حده العرفى اى عرف القراء فمن اقبح البدعة واشد الكراهة لاسيما وقد يقتجى بهم بعض الجهلة من القراء.   نهاية القول المفيد فى علم التجويد للشيخ محمد مكى  نصر ص১৬৬ ) كلمات اذان مين مد كى تحقيق لابى الحسن الاعظمى,  مجالس ابرار ص  ১৩৫)

আনুবাদঃ মাদ্দে ত্ববাঈর পরিমাণ হল এক আলিফ। চাই তাতে ওয়াক্‌ফ করা হোক বা মিলিয়ে পড়া হোক। মাদ্দে ত্ববাঈতে এক আলিফ থেকে কম টানা হারাম। কেউ এমনটা করলে তাকে পাকড়াও করা হবে। আর এক আলিফ থেকে কম টানা ছেড়ে দেওয়ার কারণে সাওয়াব লেখা হবে। কাজেই কিছু কিছু মসজিদের ইমামগণ এবং অধিকাংশ মুআয্যিনগণ মাদ্দে ত্ববাঈকে কিরাআতের পরিভাষায় তার প্রচলিত সীমা থেকে বেশি টেনে থাকেন এটা নিকৃষ্টতম বিদ‘আত এবং শক্ত পর্যায়ের মাকরূহ। বিশেষত যখন তাদেরকে কিছু মূর্খ কারীগণ অনুসরণ করে থাকেন। নেহায়াতুল কাওলুল মুফীদ ফী ইলমিত তাজবীদ পৃ.১৬৬ (কালিমায়ে আযান মে মাদ্দ কি তাহকীক, মাজালিসে আবরার পৃ.১৩৫)

 ২. فانه لايجوز قصر احدهما عند جميع القراء ولو قرأ بالقصر يكون لحنا جليا و خطأ فاحشا مخالفا لما ثبت عن النبى صلى الله عليه وسلم بالطرق المتواترة, و كذا اذا زاد فى المد الاصلى والطبعى على مد العرفى من قدر الف بان جعله قدر الفين او اكثر كما يفعله اكثر الائمة من الشافعية و الحنفية فى الحرمين الشريفين فانه محرم قبيح لاسيما وقد يقتدى بهم بعض الجهلة و يستحسن ماصدر عنهم من القراءة.  ( المنح الفكرية شرح مقدمة الجزرية ص৫৬)

অনুবাদ: মাদ্দে ওয়াজিব এবং মাদ্দে লাযেমে সকল কারীদের নিকট মাদ্দ ছেড়ে দেওয়া বা কম করা নাজায়েয। যদি তা মাদ্দ ছাড়া পড়া হয় তাহলে লাহনে জলী এবং মারাত্মক ভুল হবে এবং নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম  থেকে মুতাওয়াতিরভাবে যা প্রমাণিত তার বিপরীত হবে। অনুরূপ হুকুম হবে যখন মাদ্দে আসলী ও মাদ্দে ত্ববাঈকে এক আলিফ থেকে বেশি টানা হবে। অর্থাৎ দুই আলিফ বা তার চেয়ে বেশি টানা হয়। যেমনটি করে থাকে হারামাইন শরীফাইনের হানাফী ও শাফেয়ী মাযহাবের অধিকাংশ ইমামগণ। এটা নিকৃষ্ট হারাম…  (আল মিনাহুল ফিকরিয়্যাহ শরহু মুকদ্দামাতিল জাযরিয়্যাহ পৃ.৫৬)

 ৩. ويترسل فيه اى يتمهل بلا لحن وترجيع… فلا ينقص شيئا من حروفه ولايزيد من كيفيات الحروف كالحركات و السكنات و المدات و غير ذالك لتحسين الصوت.  شرح الوقاية ১৩৪/১

অনুবাদ: আর আযান দিবে ধীরে ধীরে কোনো লাহন (মাদ্দের অতিরিক্ত টানা) ও তারজী (প্রথমে আস্তে পরে বড় আওয়াজে বলা) ছাড়া। সুতরাং আযানের মধ্যে কোনো হরফ কমাবে না এবং তার মধ্যে কোনো হরফ বাড়াবে না। অনুরূপভাবে আওয়াজকে সুন্দর করার জন্য হরফের অবস্থার মধ্যে বাড়াবে-কমাবে না যেমন: হরকত, সাকিন, মাদ্দ ইত্যাদি। (শরহে বেকায়া ১/১৩৪)

উল্লেখ্য এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, আযানের মধ্যে মাদ্দ বাড়াবে না কমাবে না। সুতরাং আল্লাহু আকবার এর লামের মধ্যে এক আলিফ মাদ্দকে অধিকাংশ মুআয্যিনগণ যে ৩/৪ আলিফ টানতে থাকেন তা নিঃসন্দেহে ভুল এবং সুন্নাতের খেলাফ।

 ৪. والترجيع بالقران و الاذان بالصوت الطيب طيب ان لم تزد فيه الحروف وان زاد كره له.  الدر المختار ৬০৪/৯

অনুবাদ: সুমিষ্ট আওয়াজে টেনে টেনে কুরআন পড়া এবং আযান দেয়া উত্তম যতক্ষণ না তার ভেতর হরফ বাড়ানো হয়। আর যদি হরফ বাড়ানো হয় তবে তা মাকরূহ। আদ্দুরুল মুখতার ৯/৬০৪

আর একথা স্পষ্ট যে, মাদ্দকে তার গন্ডি থেকে বাড়িয়ে দিলে অবশ্যই সেখানে কোনো না কোনো হরফ বৃদ্ধি পাবে। যা জ্ঞানী ব্যক্তি মাত্রই বুঝতে সক্ষম।

   .৫وفى الذخيرة وان كانت الالحان لاتغير الكلمة عن وضعها و لاتؤدى الى تطو يل الحروف التى حصل التغنى بها حتى يصير الحرف حرفين بل لتحسين الصوت و تزيين القراءة لايوجب فساد الصلاة و ذالك مستحب عند نا فى الصلاة وخارجها. رد المحتار ৬০৪/৯

অনুবাদ: যদি সূর শব্দের গঠনে পরিবর্তন না আনে এবং হরফকে লম্বা না করে যেমন: এক হরফকে দুই হরফ বানিয়ে দেয়া; বরং সূর আওয়াজ ও কিরাআতের সৌন্দর্য করণের জন্য হয় তাহলে, তা নামাযকে ফাসেদ করবে না। এটা আমাদের নিকট নামাযে এবং নামাযের বাহিরে মুস্তাহাব। (রদ্দুল মুহতার ৯/৬০৪)

  ৬. ويكره التلحين و هو التغنى بحيث يؤدى الى تغير كلماته كذا فى شرح المجمع لابن الملك و تحسين الصوت للاذان حسن ما لم يكن لحنا كذا فى السراجية. الفتاوى الهندية ৫৬/১

অনুবাদ: তালহীন করা মাকরূহ। আর তালহীন হলো এমনভাবে সূর দেয়া যে, তা শব্দের গঠনে পরিবর্তন আনে। আযানের জন্য আওয়াজকে সুন্দর করা পছন্দনীয়, যতক্ষণ না তা শব্দের ভেতর পরিবর্তন নিয়ে আসে। (ফাতাওয়ায়ে আলমগিরী ১/৫৬)

উল্লেখ্য মাদ্দের মধ্যে কম-বেশি করলে শব্দের গঠনের ভেতর পরিবর্তন আসে। সুতরাং প্রত্যেক মাদ্দকে তার নিয়ম অনুযায়ী টানা জরুরী। সুর করার জন্য বেশি টানা যাবে না।

 ৭. قال الشيخ اللكنوى فى السعاية على قول شرح الوقاية  : قوله فلا ينقص شيئا من حروفه الخ هذا بظاهره يفيد انه يكره التلحين فى جميع كلمات الاذان و عليه الجمهور. السعاية ১৫/১

অনুবাদ: শরহে বেকায়ার উক্তি ‘সুতরাং আযানের হরফসমূহের মধ্যে কোনো হরফকে (যেখানে মাদ্দ আছে সেখানে মাদ্দ না করার দ্বারা) কমাবে না…’ উল্লেখিত উক্তি দ্বারা স্পষ্টভাবে বুঝে আসে যে, আযানের যেকোনো বাক্যে কোনো হরফকে পরিবর্তন করা মাকরূহ। আর এটাই জমহূরের মত। (আসসিআয়াহ ১/১৫)

 ৮. التغنى و الترنم فى الاذان بالطريقة المعروفة عند الناس فى زما ننا هذا لايقرها الشرع لانه عبادة يقصد منها الخشوع لله تعالى … الحنفية قالواঃ التغنى بالاذان حسن الا اذا ادى الى تغيير الكلمات  بزيادة حركة او حرف فانه يحرم فعله ولايحل سماعه. كتاب الفقه على المذاهب الاربعة ৩৯১/১

বর্তমানে প্রচলিত নিয়মে যেভাবে আযান দেওয়া হয়, শরীয়ত তা সমর্থন করে না। কারণ আযান এমন একটি ইবাদত যার মধ্যে খুশু-খুযু কাম্য। হানাফীদের নিকট সুন্দর আওয়াজে আযান দেওয়া উত্তম। তবে এটা যেন শব্দের মধ্যে পরিবর্তন না আনে যেমন, হরকত বা হরফ বাড়িয়ে দেওয়া। কারণ এমনটি করা হারাম এবং এমন আযান শোনা  তথা সমর্থন করা জায়েয নয়।

৯. বুখারী শরীফের কিতাবুল আযানে আছে হযরত উমর বিন আব্দুল আযীয রহ. যিনি এই উম্মতের প্রথম মুজাদ্দিদ ছিলেন তিনি তার মুআয্যিনকে বললেন, اذن اذانا سمحا والا فاعتزلنا ‘সাদাসিধে আযান দাও অন্যথায় আযান দেওয়া বন্ধ করো’ । (বুখারী শরীফ, কিতাবুল আযান, বাবু রফউস সাওতি বিন্নিদা)

বর্তমান যামানায় মাদ্দের মধ্যে বৃদ্ধি করে যেভাবে রং-ঢং এর আযান দেওয়া হচ্ছে আবার অনেকে গানের সূরে আযান দিচ্ছে তা কোনো অবস্থায় বুখারী শরীফের এই হাদীস অনুযায়ী হচ্ছে না। বরং তা মুআয্যিনদের খামখেয়ালী ও মনগড়া খেলাফে সুন্নাত আযান। নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাতের অনুসারীদের জন্য বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে অনুধাবন করা উচিৎ এবং সর্বত্র সাদাসিধে সুন্নাত তরীকার আযান চালু করা উচিৎ।

অনেকে কারী ফাতাহ মুহাম্মাদ রহ. এর কিতাব ‘মেফতাহুল কামাল শরহু তুহফাতিল আতফাল’ এর বরাত দিয়ে মুফীদুল আকওয়াল এবং ফাতহুল মালিকিল মুতাআ‘ল নামক কিতাবদ্বয়ের নিম্নোক্ত  এবারত পেশ করে থাকেন:

وله سبب معنوى كالتعظيم ولاجله اجاز الفقهاء مد الف الجلالة اربع عشرة حركة فى الله اكبر.

‘মাদ্দের আভ্যন্তরীন কারণ রয়েছে যেমন মাদ্দে তা‘যীম। আর এ কারণেই ফুকাহায়ে কেরাম আল্লাহু আকবারে আল্লাহু শব্দে সাত আলিফ পর্যন্ত টানার অনুমতি দিয়েছেন।’ অথচ ফিকহের নির্ভরযোগ্য কোনো কিতাবে কোনো ফকীহ আল্লাহু আকবার এর আল্লাহু শব্দে সাত আলিফ পর্যন্ত টানার অনুমতি দিয়েছেন এমনটি পাওয়া যায় না।

আর আল্লাহু শব্দকে মিলিয়ে পড়ার সময় সাবাবে মা‘নাবী এর কথা বলে এক আলিফ থেকে বেশি টানা একাধিক কারণে সঠিক নয়:

১. এটা একটা দুর্বল কারণ অর্থাৎ সাবাব টি সাবাবে যয়ীফ।

২. আহলে আরব সাবাবে মা‘নবী এর কারণে যে মাদ্দে তা‘যীম এর কথা বলে থাকে তা লায়ে নাফী জিন্স এ ব্যবহৃত হয়। যাতে নাফী এর মধ্যে মুবালাগা হয়। যেমন: لااله الاانت। মুহাক্কিক ইবনুল জাযরী রহ. মাদ্দে তা‘যীমীকে আল্লাহু শব্দে বলেননি। তিনি বলেন,

واما السبب المعنوى فهو قصد المبالغة فى النفى وهو سبب قوى مقصود عند العرب وان كان اضعف من السبب اللفظى عند القراء ومنه مد التعظيم نحو لااله الاالله,لااله الاهو

‘আর মাদ্দের আভ্যন্তরীন কারণ, তা হল না সূচককরনকে অতিরঞ্জন করা। এটা আরবদের নিকট একটা শক্তিশালী কারণ। যদিও তা কারীদের নিকট শাব্দিক কারণ থেকে দুর্বল। আর এর মধ্য থেকে হচ্ছে মাদ্দে তা‘যীম যেমন لااله الاالله,لااله الاهو ’

এ ধরনের কিছু ইবারত দেখে মানুষ আযানের মধ্যেও মাদ্দে তা‘যীম এর কথা বলে আল্লাহু শব্দে মিলিয়ে পড়ার সময়ও টান শুরু করে দেয়। অথচ এই মাদ্দ লায়ে নাফী জিন্স এর জন্য প্রযোজ্য।

৩. এটা ইমাম শাতেবী রহ. এবং জমহুর কারীদের নিকট আমলযোগ্য নয়।

৪. অধিকাংশ উলামাদের মতে আল্লাহু শব্দে মিলিয়ে পড়ার সময় এক আলিফ থেকে বেশি টানা শুধু নাজায়েয নয় বরং নিকৃষ্ট বিদ‘আত বলা হয়েছে। আর কেউ কেউ জায়েয বলেছেন। আর মূলনীতি হলো, যখন কোনো বিষয়ে জায়েয ও নাজায়েয এর মধ্যে সংঘর্ষ হয় তখন না জায়েযকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।

অনেকে তাআমুল এর কথা বলে এটা জায়েয বলতে চায়। অথচ যে কোনো তাআমুল দলীল নয়। তাআমুল দলীল হওয়ার জন্য শর্ত হলো তা নস (দলীল) এর খেলাফ না হওয়া। আর উপরে আযান সম্পর্কে স্পষ্ট দলীল উল্লেখ করা হয়েছে। তাই এই দলীল এর বিরুদ্ধে তাআমুল গ্রহণযোগ্য নয়।

সারকথা হলো আযানে আল্লাহু আকবারের আল্লাহু শব্দের লাম এর মধ্যে মাদ্দে তবাঈ অর্থাৎ এক আলিফ টান হবে। এখানে এক আলিফ থেকে বেশি টানা যাবে না। হ্যাঁ, আল্লাহু শব্দ যখন বাক্যের শেষে আসে অনুরূপভাবে الفلاح , الصلاة তে মাদ্দে আরেযীর কারণে আমাদের কিরাআতে তিন আলিফ এবং অন্য মাযহাব মতে পাঁচ আলিফ পর্যন্ত টানা জায়েয আছে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সঠিক জিনিস জানার ও মানার তাওফীক দান করুন। আমীন।