ইনশাআল্লাহ জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদরাসায় দাওয়াতুল হকের মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ঈসায়ী।

সুখবর! সুখবর!! সুখবর!!! হযরতওয়ালা দা.বা. এর গুরুত্বপূর্ণ ২ টি নতুন কিতাব বেড়িয়েছে। “নবীজীর (সা.) নামায” এবং “খ্রিষ্টধর্ম কিছু জিজ্ঞাসা ও পর্যালোচনা”।  আজই সংগ্রহ করুন।

হযরতওয়ালা দা.বা. এর কিতাব অনলাইনের মাধ্যমে কিনতে চাইলে ভিজিট করুনঃ www.maktabatunnoor.com

জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদরাসা থেকে প্রকাশিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার পেতে ক্লিক করুন

হযরতওয়ালা দা.বা. এর সমস্ত কিতাব, বয়ান, প্রবন্ধ, মালফুযাত পেতে   ইসলামী যিন্দেগী  App টি এবং থেকে সংগ্রহ করুন।

www.darsemansoor.org এখন www.darsemansoor.comপরিবর্তিত হয়েছে।

হযরতওয়ালা দা.বা. কর্তৃক সংকলিত চিরস্থায়ী ক্যালেন্ডার ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

হযরতওয়ালা শাইখুল হাদীস মুফতী মনসূরুল হক দা.বা. এর বয়ান এবং সমস্ত কিতাব, প্রবন্ধ, মালফুযাত একসাথে ১টি অ্যাপে পেতে ইসলামী যিন্দেগী অ্যাপটি আপনার মোবাইলে ইন্সটল করুন। Play Storeএবং  App Store

মহিলাদের মসজিদে গমন নাজায়েয

দীন নাযিল হয়েছে দীর্ঘ তেইশ বছরে, ধীরে ধীরে, বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে। এ কারণেই প্রাথমিক যুগের এমন অনেক হুকুম রয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে রহিত করে নতুন হুকুম দেয়া হয়েছে। কখনো আবার কোনো বিষয়ের অবকাশের গণ্ডি সীমিত করে তুলনামূলক কঠিন হুকুম দেয়া হয়েছে। প্রথম হুকুমটি যদিও হাদীসের কিতাবগুলোতে বিদ্যমান রয়েছে, কিন্তু সেগুলো উম্মতের জন্য আমলযোগ্য নয়; বরং আমলযোগ্য হলো সুন্নাত তথা কোনো বিষয়ের সর্বশেষ হুকুম, যা সাধারণ অবস্থায় সকলের জন্য বলা হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ শুরু যুগে ইমাম সাহেব কোনে উযরের কারণে বসে নামায পড়ালে মুসল্লিদের মধ্যে যাদের কোনো উযর নেই- তাদেরও ইমামের অনুসরণে বসে নামায পড়ার বিধান ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে এ হুকুম রহিত হয়ে গেছে। এখন উযরের কারণে ইমাম সাহেব বসে পড়লেও মুসল্লিদের যাদের কোনো উযর নেই, তাদের জন্য বসে পড়া জায়েয নেই। কেননা, উম্মতের জন্য সর্বশেষ হুকুম হলো ‘উযর না থাকলে দাঁড়িয়ে পড়া’। এখানে বুখারী শরীফে ইমাম বুখারী রহ. এর বক্তব্যটি সবিশেষ লক্ষণীয়, তিনি বলেন,

قال الحميدي: قوله: إذا صلى جالسا فصلوا جلوسا فهو في مرضه القديم، ثم صلى بعد ذلك النبي صلى الله عليه وسلم جالسا، والناس خلفه قياما، لم يأمرهم بالقعود، وإنما يؤخذ بالآخر فالآخر، من فعل النبي صلى الله عليه وسلم.

অর্থ: হুমাইদী (ইমাম বুখারী রহ. এর বিশিষ্ট উস্তাদ) বলেন, নবীজীর এ নির্দেশ ‘যখন ইমাম বসে নামায পড়ে, তখন তোমরাও (উযর না থাকলেও) বসে নামায পড়ো’ এ বিধানটি ছিলো নবীজীর অসুস্থতার যামানার প্রাথমিক নির্দেশ। পরবর্তীতে নবীজী স্বয়ং বসে ইমাম হয়ে নামায পড়েছেন এবং সাহাবায়ে কেরাম পিছনে দাঁড়িয়ে ইক্তেদা করেছেন! নবীজী তাদেরকে বসে নামায পড়ার আদেশ দেননি। আর নবীজীর সর্বশেষ আমলই গ্রহণযোগ্য।

একইভাবে মহিলাদের মসজিদে গমন করার বিষয়টিও ইসলামের প্রাথমিক যুগে অনুমোদিত ছিলো। পরবর্তীতে সেটাকে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। শুরু যুগে মহিলাদের মসজিদে আসার যে অনুমতি দেয়া হয়েছিলো, তার ভিত্তি ছিলো দু’টি জিনিসের উপর। এক. ইসলামের সূচনালগ্ন হওয়ায় দীনী ইলমের ব্যাপক প্রচার প্রসারের স্বার্থে পুরুষ মহিলাসহ সকলের জন্য মসজিদে এসে সরাসরি নবীজীর কাছ থেকে হুকুম-আহকাম জানার প্রয়োজন। দুই. ফিতনার আশঙ্কা না থাকা।

কিন্তু পরবর্তীতে একদিকে যখন দীনী ইলমের ব্যাপক প্রচার-প্রসার হয়ে গেলো অপরদিকে ‘খাইরুল কুরুন’ তথা সর্বশ্রেষ্ঠ তিন যুগেই মহিলারা রাসূলের নির্দেশ অমান্য করে খুশবু ব্যবহার করে, সেজে-গুজে মসজিদে আসতে শুরু করলো, তখন ফিতনা ফাঁসাদের প্রবল আশঙ্কায় হযরত আয়েশা রাযি., উমর রাযি., ইবনে মাসঊদ রাযি.-সহ অনেক সাহাবায়ে কেরাম কঠোরভাবে মহিলাদের মসজিদে গমনকে নিষেধ করলেন তাঁরা নিজেদের এ নিষেধাজ্ঞার সমর্থনে এ কথাও ঘোষণা করলেন যে, ‘নবীজী যদি জীবিত থাকতেন, তবে তিনিও অবশ্যই এ পরিস্থিতিতে মহিলাদেরকে মসজিদে গমন করতে কঠোরভাবে নিষেধ করতেন’। অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামও মৌনভাবে তাদের এ নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করলেন। কেননা, এ নিষেধাজ্ঞা ছিলো, শরীআতের রুচিবোধ এবং নবীজীর মানশা ও ইচ্ছার সঠিক বাস্তবায়ন। সাহাবায়ে কেরামের অনুসরণে উলামায়ে পরবর্তী কেরাম এখনো মহিলাদের মসজিদে গমন করাকে নাজায়েয বলে থাকেন।

এখন আমরা কুরআন, হাদীস, সাহাবাদের আমল ও ফুকাহায়ে কেরামের সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করবো যার দ্বারা একথা প্রমাণিত হবে যে, বর্তমান যুগে মহিলাদের মসজিদে গিয়ে জামা‘আতে অংশ গ্রহণ করা নাজায়েয।

কুরআনে কারীমের আয়াত: وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى

অর্থ: তোমরা (নারীরা) তোমাদের ঘরে অবস্থান করো এবং জাহিলিয়্যাত যুগের নারীদের মত দেহ সৌষ্ঠব ও সৌন্দর্য প্রদর্শন করে ঘোরাফেরা করো না।

قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ * وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ …

অর্থাৎ তোমরা মুমিন পুরুষদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে। এটাই তাদের জন্য শুদ্ধতর। তারা যা-কিছু করে আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত। এবং মুমিন নারীদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি আনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে। এবং নিজেদের ভূষণ অন্যদের কাছে প্রকাশ না করে, তবে এমনিতেই যা প্রকাশ পেয়ে যায় (সেটার কথা ভিন্ন) এবং তারা যেন তাদের ওড়নার আঁচল নিজ বক্ষদেশে নামিয়ে দেয় …।

এই দু’টি আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নারীদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা ঘরোয়া পরিবেশে পবিত্র জীবন যাপন করে এবং বেগানা পুরুষদের থেকে নিজেদের পরিপূর্ণভাবে সংযত রাখে এবং জাহিলী যুগের নারীদের মত নিজের সৌন্দর্য ও সাজ-সজ্জা প্রদর্শন করে না বেড়ায়। বর্তমান ফিতনা ফাঁসাদের ছড়াছড়ির যুগে ব্যাপকভাবে মহিলারা নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ করে বেড়ায়, যার দ্বারা ফিতনা সৃষ্টির প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। সে হিসাবে তাদের মসজিদে যাওয়া কখনো জায়েয হতে পারে না।

হাদীসের আলোকে মহিলাদের মসজিদে গমন

১. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘নারী আপাদমস্তক আবরণীয়। যখন সে বাইরে বের হয় শয়তান তার দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। নারী যতক্ষণ ঘরের ভিতরে থাকে আল্লাহর রহমতে অধিক নিকটে থাকে।

২. হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে মহিলা সুগন্ধি ব্যবহার করেছে সে যেন আমাদের সাথে ইশার নামাযে শরীক না হয়।

৩. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযি. এর সূত্রে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, মহিলার জন্য ঘরের আঙ্গিনায় নামায অপেক্ষা তার ঘরে নামায পড়া উত্তম। আর ঘরে নামায অপেক্ষা নিভৃত ও একান্ত কোঠায় নামায পড়া উত্তম।

৪. একদা হযরত উম্মে হুমাইদ রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে এসে বললেন, আমি আপনার সঙ্গে নামায নামায পড়তে ভালবাসি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি জানি তুমি আমার সঙ্গে নামায পড়তে ভালোবাস। কিন্তু তোমার ঘরে নামায বাইরের হুজরায় নামায অপেক্ষা উত্তম। আর তোমার হুজরায় নামায তোমার বাড়ীতে নামায অপেক্ষা উত্তম। আর তোমার বাড়ীতে নামায তোমার মহল্লার মসজিদে নামায অপেক্ষা উত্তম। আর তোমার মহল্লার মসজিদে নামায আমার মসজিদে নামায অপেক্ষা উত্তম। অতঃপর উক্ত মহিলা নিজ ঘরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নামাযের স্থান নির্ধারণ করে নিলো এবং আমরণ তাতেই নামায আদায় করলো।

প্রথম হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, নারীদের ব্যাপারে শরীআতের রুচিবোধ হলো যে, তারা ঘরে অবস্থান করবে। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হবে না। দ্বিতীয় হাদীসে স্বয়ং নবীজী সুগন্ধি ব্যবহার করলে ফিতনা সৃষ্টি হবে এই আশঙ্কায় সুগন্ধি ব্যবহারকারিণী মহিলা সাহাবীদেরকে মসজিদে আসতে নিষেধ করেছেন। তৃতীয় হাদীসে সে আশঙ্কার বাস্তবায়িত হওয়ার বিষয়টিই হযরত ইবনে উমর রাযি. উল্লেখ করেছেন। শেষোক্ত দু’টি হাদীস থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, মহিলাদেরকে মসজিদে গিয়ে নামায পড়তে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিরুৎসাহিত করেছেন এবং তাদের জন্য মসজিদে গিয়ে জামা‘আতের সাথে নামায পড়ার চেয়ে ঘরে নামায পড়াকে উত্তম বলেছেন।

সারকথা, যে বিষয়টি শরীআতের রুচিবোধের বিপরীত বিষয়, নবীজী স্বয়ং যে বিষয়ে নিরুৎসাহিত করেছেন সে বিষয়টি কী করে বর্তমানে বৈধতার অনুমতি পেতে পারে।

মহিলাদের মসজিদে গমন প্রসঙ্গে সাহাবায়ে কেরামের অবস্থান

১. হযরত আমর শাইবানী রহ. বলেন, আমি (এ উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ফিকহবিদ) সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযি. কে দেখেছি, তিনি জুমু‘আর দিনে মহিলাদেরকে মসজিদ থেকে বের করে দিতেন এবং বলতেন, তোমরা ঘরে চলে যাও; তোমাদের জন্য এটাই উত্তম।

২. হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখতেন যে, মহিলারা (সাজ-সজ্জা গ্রহণে, সুগন্ধি ব্যবহারে ও সুন্দর পোশাক পরিধানে) কী পন্থা অবলম্বন করেছে তাহলে অবশ্যই তাদেরকে মসজিদে যেতে নিষেধ করে দিতেন, যেমন নিষেধ করা হয়েছিলো বনী ইসরাইলের মহিলাদেরকে।

আম্মাজান আয়েশা রাযি. একথা যখন বলছেন, তখন ছিলো ‘খাইরুল কুরুন’ তথা ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ তিন যুগের সময়কাল। তাবেয়ীগণের সাথে সাথে অনেক সাহাবীও তখন জীবিত ছিলেন। লক্ষণীয় হলো, যে বিষয়টি ‘খাইরুল কুরুন’ তথা সর্বশ্রেষ্ঠ তিন যুগেও নবীজীর অনুমোদন প্রাপ্তির যোগ্যতা রাখে না, চৌদ্দশ বছর পরে নৈতিক অবক্ষয়ের এ চরম দুর্যোগময় মুহূর্তে তা কীভাবে অনুমোদিত হতে পারে?

ফুকাহায়ে কেরামের সিদ্ধান্ত

হানাফী মাযহাব: হানাফী মাযহাবে মহিলাদের জন্য যুবতী হোক কিংবা বৃদ্ধা, ওয়াজ নসীহত শ্রবণ কিংবা নামাযের জন্য মসজিদে গমন বৈধ নয়।

আল্লামা হাসকাফী রহ. আদ্দুররুল মুখতারে (১/৫৬৬) বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন।

মালেকী মাযহাব: মালেকী মাযহাব মতে বৃদ্ধা মহিলা যাদের প্রতি সাধারণত পুরুষদের আকর্ষণ সৃষ্টি হয় না, তাদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায, ঈদের নামায ও ইস্তিসকার নামাযের উদ্দেশ্যে বের হওয়া জায়েয আছে, তবে অনুত্তম। এমনিভাবে যুবতী মহিলা-যে সুন্দরী নয়- ফরয নামাযের জামা‘আতে বা আত্মীয়-স্বজনদের জানাযার নামাযে শরীক হতে মসজিদে আসতে পারে তবে। শর্ত হলো, সুগন্ধি ব্যবহার এবং সাজ-সজ্জা করবে না, ফিতনায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না, সাধারণ কাপড় পরে বের হবে, পুরুষদের ভিড়ে পড়বেনা এবং রাস্তা বিপদ-আপদ মুক্ত থাকতে হবে। এ সকল শর্তের কোন একটি না পাওয়া গেলে মসজিদে যাওয়া হারাম। আর যুবতী নারী সুন্দরী হলে কোনো অবস্থাতেই জায়েয নয়।

শাফেয়ী মাযহাব: শাফেয়ী মাযহাবের ইমামগণ বলেন, যদি সে যুবতী কিংবা তার প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হয় এমন বৃদ্ধা হয় তাহলে তার জন্য এটা মাকরূহে তাহরীমী এবং তার স্বামী বা অন্যান্য অভিভাবকের জন্য তাকে সুযোগ দেয়াটাও মাকরূহে তাহরীমী হবে। তবে যদি এমন বৃদ্ধা হয় যে, তার প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হয় না তাহলে তার মাকরূহ হবে না।

আল্লামা নববী রহ. শরহুল মুহায্যাব   গ্রন্থে ‘শাফেয়ী মাযহাবে’র বিবরণ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন।

হাম্বলী মাযহাব: হাম্বলী মাযহাব মতেও সর্বাবস্থায় মহিলার জন্য তাদের ঘরে নামায পড়া উত্তম এবং যদি ফেতনার আশঙ্কা হয়, তবে তাদেরকে মসজিদে যেতে নিষেধ করার কথা বলা হয়েছে।

হুকুমের শর্তাবলীর ব্যাপারে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও মাযহাব চতুষ্টয়ের সারকথা হলো, ‘মহিলাদের মসজিদে গমনের বৈধতার ক্ষেত্রে শর্ত হলো ‘ফিতনার আশঙ্কা না থাকা’। আর বর্তমান যামানায় যেহেতু ফেতনা সৃষ্টির আশঙ্কাই প্রবল এ কারণে হানাফী ফকীহগণ সর্বক্ষেত্রে সকল মহিলার জন্য মসজিদে গিয়ে নামায পড়াকে নাজায়েয ফাতাওয়া দিয়েছেন।

মহিলাদের মসজিদে গমন বৈধতা প্রসঙ্গে হাদীসের কয়েকটি বর্ণনা ও তার পর্যালোচনা

১. ইবনে উমর রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, যখন তোমাদের মহিলারা মসজিদে যাওয়ার জন্য তোমাদের কাছে অনুমতি চায় তোমরা তাদেরকে অনুমতি দিও।

২. উম্মে আতিয়্যা রাযি. থেকে বর্ণিত যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুমারী, যুবতী, পর্দাশীল এবং হায়েযা মহিলাদেরকে দুই ঈদে ঈদগাহে নিয়ে যেতেন। তবে হায়েযা মহিলারা ঈদগাহে আলাদা এক স্থানে অবস্থান করতো। তারা মুসলমানদের ওয়াজ-নসীহতে অংশ গ্রহণ করতো। এক মহিলা জিজ্ঞাসা করলো, হে আল্লাহর রাসূল! যদি কারো কাছে চাদরের ব্যবস্থা না থাকে? তিনি উত্তরে বললেন, তার কোন বোন যেন তাকে চাদর দিয়ে সহযোগিতা করে।

পর্যালোচনা

মহিলাদের মসজিদে গমনের বৈধতা প্রসঙ্গে এ জাতীয় কিছু হাদীস যদিও হাদীসের কিতাবগুলোতে রয়েছে, তথাপি তা উম্মতের জন্য দু কারণে আমলযোগ্য নয়-

এক. বৈধতার হাদীসগুলো ইসলামের প্রাথমিক যামানার, পরবর্তীতে নবীজী স্বয়ং উম্মে হুমাইদ রাযি. কে মসজিদে আসতে নিরুৎসাহিত করে সে বৈধতাকে একপ্রকার নিষেধই করে দিয়েছেন।

দুই. বৈধতার ভিত্তি মৌলিকভাবে নামায পড়া ছিলো না, (এ কারণেই তো হায়েযা মহিলারাও ঈদগাহে যেতো। যদি নামায পড়াই মূল উদ্দেশ্য থাকতো তাহলে তাদের সেখানে যাওয়ার কী অর্থ?) বরং এ বৈধতার ভিত্তি ছিলো ‘মহিলারা যেন দীনী ইলম শিখতে পারে’, যা দ্বিতীয় হাদীসে পরিষ্কার উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে দীনী ইলমের ব্যাপক প্রচার-প্রসারের দরুন সে অবস্থা আর বাকী থাকেনি। উপরন্তু ফেতনার আশঙ্কাও ক্রমেই প্রবলতর হয়েছে। এ কারণেই আয়েশা রাযি. ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম কঠোরভাবে মহিলাদের জন্য মসজিদে যাওয়াকে নিষেধ করেছেন। অতএব এ সকল হাদীসকে ভিত্তি বানিয়ে ফিতনা-ফাঁসাদের এই যুগে মহিলাদেরকে মসজিদে যেতে উৎসাহিত করার কোন সুযোগ নেই।

আর বর্তমানে হারামাইন শরীফাইন ও মক্কা-মদিনার পথে মহিলাদের নামাযের ব্যবস্থা মূলত স্বতন্ত্রভাবে মসজিদে এসে মহিলাদের নামায আদায়ের ব্যবস্থাপনা নয়; বরং উদ্দেশ্য হলো হজ্জ-উমরার আমল, যেমন তওয়াফ, সাঈ, যিয়ারত ইত্যাদি করতে এসে যদি নামাযের সময় হয়ে যায়, তবে যেন মা বোনদের নামায কাযা না হয়। অন্যথায় এ সকল স্থানে স্থানীয় আরব মহিলাদেরকে সাধারণত দেখা যায় না তারা নিজেদের ঘরেই নামায পড়ে নেয়।

সারকথা, মহিলাদের মসজিদে গমনের নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে এমন কোন নির্ভরযোগ্য হাদীস ও ফিকহী বর্ণনা নেই, যার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কোন যুগে মহিলাদের মসজিদে গমন ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত, মুস্তাহাব কিংবা অধিক সওয়াবের কাজ ছিলো এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম ও পরবর্তী ফেকাহবিদ ইমামগণ মহিলাদেরকে মসজিদে গমনে উৎসাহিত করেছেন; বরং মহিলাদের মসজিদে গমনের বিষয়ে নবীজী সুস্পষ্ট অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। একই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী চার মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গিও এ নিষেধাজ্ঞার স্বীকৃতি দিচ্ছে। এক্ষেত্রে কয়েকজন ‘হাদীস অজ্ঞদের’ বক্তব্যের কারণে এ নৈতিক অবক্ষয়ের চরম মুহূর্তে কী করে তা সওয়াব ও আগ্রহের কাজ হতে পারে? যে সকল আলেম বা স্কলারগণ বর্তমানে মহিলাদেরকে মসজিদে গমনে উৎসাহিত করেন, তাঁরা কী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত আয়েশা রাযি. ও ইবনে মাসঊদ রাযি. এবং মুজতাহিদ ইমামগণের চেয়েও বেশি যোগ্য ও অনুসরণীয় হয়ে গেলেন?

কাজেই যদি সুন্নাতের উপর আমল করতে হয় এবং আখেরাতে সওয়াব প্রাপ্তিই উদ্দেশ্য হয়, তবে মা-বোনদের উচিত ঘরেই নামায আদায় করা। আর তাদের পুরুষ অভিভাবকদেরও কর্তব্য এ ব্যাপারে তাদেরকে সহযোগিতা করা। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন। আমীন।