হযরতওয়ালা দা.বা. এর সমস্ত কিতাব, বয়ান, প্রবন্ধ, মালফুযাত পেতে   ইসলামী যিন্দেগী  App টি এবং থেকে সংগ্রহ করুন।

www.darsemansoor.org এখন www.darsemansoor.comপরিবর্তিত হয়েছে।

হযরতওয়ালা দা.বা. কর্তৃক সংকলিত চিরস্থায়ী ক্যালেন্ডার ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন

জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদরাসা থেকে প্রকাশিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার পেতে ক্লিক করুন

www.darsemansoor.org এখন www.darsemansoor.com

হযরতওয়ালা শাইখুল হাদীস মুফতী মনসূরুল হক দা.বা. এর বয়ান এবং সমস্ত কিতাব, প্রবন্ধ, মালফুযাত একসাথে ১টি অ্যাপে পেতে ইসলামী যিন্দেগী অ্যাপটি আপনার মোবাইলে ইন্সটল করুন। Play Storeএবং  App Store

জীবনী ও কর্মজীবন

সামাজিক জীবনে প্রত্যেক মানুষ অপরাপর মানুষের সঙ্গে বিভিন্ন সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ। এগুলোর কিছু সম্পর্ক তো সৃষ্টিগত, খোদাপ্রদত্ত আর কিছু সস্পর্ক স্বয়ং মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনে সৃষ্ট। প্রতিটি সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাফল্য লাভের কিছু নির্দিষ্ট নিয়মনীতি আছে এবং আছে সুনির্দিষ্ট মানদন্ড। এ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অপর প্রান্তের প্রতি কিছু কর্তব্য পালন করলে মানুষ অভিহিত হয় ভালো পিতা, সৎ প্রতিবেশী, সফল ব্যবসায়ী কিংবা জনপ্রিয় রাজনীতিক হিসেবে। এর বিপরীতে যে ব্যক্তি নিয়মনীতি ভঙ্গ করে অপরের হক বিনষ্ট করে তার অবস্থান সাফল্য বা প্রিয়তা থেকে যোজন যোজন দূরে। হযরত শাইখুল হাদীস মুফতী মনসূরুল হক সাহেব দা.বা. সম্পর্কে কোনরূপ আতিশয়োক্তি ছাড়া নির্দ্বিধায়ই এ কথা বলা যায় যে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে তিনি একজন সফল মানুষ। জামি‘আ কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগের কিংবদন্তিতুল্য আসাতিযায়ে কেরামের কাছে লেখাপড়া শেষ করার পর তাঁদের তত্ত্বাবধানে সেখানেই তিনি অধ্যাপনায় যুক্ত হন। শতাব্দীর সেরা উস্তাদদের তত্ত্বাবধানে এ সময় তিনি শিক্ষকতার নাড়িনক্ষত্র আয়ত্ব করতে পেরেছিলেন। ফলে নববী তিন দায়িত্বের একটি তথা “তা’লীমে”র উপর এ সময়ই তাঁর দক্ষতা অর্জিত হয়। এরপর ১৯৮৯ ইং সালে হারদুঈর হযরত মুহিউসসুন্নাহ মাওলানা শাহ আবরারুল হক রহ. এর সান্নিধ্যে গিয়ে অবশিষ্ট দু’ দায়িত্ব তথা তাযকিয়া ও তাবলীগের গুরুত্ব অনুধাবন করেন। এ সময়ে তিনি হারদুঈর হযরত রহ. এর কাছে এ বিষয়ে দীক্ষা লাভ করেন যে, পরকালে নাজাত পাওয়ার জন্য শুধু নিজের ঈমান-আমলের সংশোধনই যথেষ্ট নয়। বরং অপরাপর মুসলমানের ঈমান-আমল বিশুদ্ধ করাও একজন ওয়ারিসে নবীর ফরয দায়িত্ব। এই দীক্ষা লাভের পর তিনি তা‘লীমের পাশাপাশি মানুষের কাছে দীন পৌঁছানোর সম্ভাব্য সকল পথে মেহনত করার ব্যাপারে আরো বেশি মনোনিবেশ করেন। দাওয়াত-তা‘লীম-তাযকিয়া সহ দীনের সকল অঙ্গনে তিনি আজো ইখলাস ও অভিজ্ঞতার সাথে সুনিপুণভাবে খিদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। ফলে আজ তিনি সকল প্রাণের প্রিয়মুখ সাব্যস্ত হয়েছেন। শাইখুল হাদীস হযরতুল আল্লাম মুফতী মনসূরুল হক সাহেব দা. বা. একাধারে সেরা শিক্ষক, প্রভাবশালী বক্তা, বিদগ্ধ ফকীহ এবং বাতিলের বিরুদ্ধে নির্ভীক সেনানায়ক। তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং কথার প্রভাবে আমির-ফকির নির্বিশেষে সবার হৃদয়ে ঈমানের আলোড়ন জাগে।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. লালবাগ মাদরাসায় থাকাকালীন উস্তাদ হিসেবে জুনিয়র ছিলেন। এ সময়ে তাঁর কাছে যে কোনো শ্রেণীর ছাত্র যে কোনো কিতাবের জটিলতার মাসআলার সহজ সমাধান পেয়ে যেতো। ছাত্ররা তাঁর কাছে দরসে নিযামীর অন্তর্ভুক্ত যে সব কিতাব হল করতে আসতো তার অধিকাংশই তার পড়ানোর দায়িত্ব ছিল না। এ কিতাবগুলো কোনো মুরুব্বী উস্তায পড়াতেন। ছাত্ররা দরসে কোনো মাসআলা না বুঝলে ভয়ের কারণে মূল উস্তাযের কাছে না গিয়ে তাঁর কাছে এসে ভীড় করতো। তিনি ছাত্রদের প্রশ্নগুলোর এমন সহজ ও সুন্দর জবাব দিতেন যে, তাদের কাছে সেই মাসআলা আয়নার মতো স্বচ্ছ হয়ে যেতো। তাঁর সমাধানগুলো শুনলে মনে হতো, যেন এইমাত্র কিতাব থেকে মুতালা‘আ করে তিনি সমাধানটি বের করেছেন।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর কিতাব বোঝানোর এই গুণটির কথা তাঁর সব যুগের ছাত্ররাই স্বীকার করেন। তাঁর বর্তমান ছাত্রদের ভাষ্যমতে, তাঁর সবকে বসে কোনো ছাত্রই বঞ্চিত হয় না। তাঁর সবক উপস্থাপনের পদ্ধতিই এমন অভিনব ও উন্নততর যে, দরস দু’ তিন ঘন্টা ব্যাপী দীর্ঘ হলেও কোনো ছাত্র মনোসংযোগ-বিচ্ছিন্ন হয় না। এতো দীর্ঘ সময়ের দরসেও ছাত্রদের কোনো ক্লান্তি, কোনো অবসাদ আচ্ছন্ন করে না। উপরন্তু দরস থেকে ওঠার পর কখনো মনে হয়, অতৃপ্তি রয়েই গেল! সর্বোপরি জামা‘আতের মেধাবী এবং দুর্বল উভয়শ্রেণীর ছাত্ররাই দরসের প্রতিটি কথা সমানভাবে আয়ত্ব এবং আত্মস্থ করতে সমর্থ হয়; যা এ যুগের উস্তাদদের মধ্যে একেবারেই দুর্লভ।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর এমন ছাত্রবান্ধব গুণের মূল রহস্য হলো, তিনি তালিবে ইলমদেরকে উম্মতের আমানত মনে করেন। এ কারণে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি হলো, উস্তাদের মধ্যে ইজতেহাদী মনোভাব থাকা অত্যন্ত জরুরী। উস্তাদ সব সময় তালিবে ইলমদেরকে সহজতম পন্থায় কিতাব বোঝানোর নিত্যনতুন পন্থা উদ্ভাবন করতে থাকবেন। যাতে কোনো সবক কোনো ছাত্রের জন্য দুরূহ না হয়ে যায়। এই ইজতেহাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর উপস্থাপনা ছাত্রদের জন্য অত্যধিক উপযোগী হয়।

দরসের শুরুতেই তিনি সেদিনের সবকের সারাংশ বলে নেন। এরপর পুরো সবকের কথাগুলো বিশদভাবে এতোটাই ধীরে ধীরে বলেন যে, কেউ কথাগুলো লিখতে চাইলে হুবহু লিখে নিতে পারে। তাছাড়া তিনি কথা বলার সময় অনেকটা ধমকের মতো জোরালো স্বরে কথা বলেন। এ কারণে কেউ না লিখলেও কথাগুলো তার অবচেতন মনের গভীরে গেঁথে যায়। দরসের কথাগুলো এতটাই বিশ্লেষণধর্মী ও বাস্তবসম্মত হয় যে, প্রতিটি মাসআলার সমস্ত দিক এবং প্রতিটি আপত্তির সকল উত্তরই আলোচনায় চলে আসে। যখন সারাংশের কথাগুলোই পুরো দরসে একে একে আসতে থাকে তখন কোনো ছাত্রের জন্য অমনোযোগিতার সুযোগ থাকে না। ছাত্রদের ঘুম বা তন্দ্রাভাব আসা তো দূরের কথা, বরং পুরো ক্লাসের সকল ছাত্রই যেন তাঁর দরসে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে কথাগুলো আত্মস্থ করতে থাকে। এরকম সুবিন্যস্ত ও ধীর উপস্থাপনার কারণে দরস থেকে ওঠার সময় একজন দুর্বল ছাত্রও সবকের আদ্যোপান্ত গুছিয়ে বলে দিতে পারে।

মুফতী সাহেব দা.বা. লালবাগ জামি‘আয় থাকাকালীন ১৯৮৬ সাল থেকে কাশিয়ানী হুজুর রহ. এর পক্ষে বুখারী ও মিশকাত শরীফের দরস দিতেন। সেই থেকে আজ অবধি প্রায় ৩০ বছর যাবত তিনি বোখারী ও মিশকাত শরীফ পড়ানোর মহান খিদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি নিয়মিত শুধু জামি‘আ রাহমানিয়ায় বুখারী শরীফের প্রথম খন্ড এবং মিশকাত শরীফের প্রথম অংশের দরস দিলেও অবসরে কখনো কখনো ঢাকা বা ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন মাদরাসায়ও বুখারী শরীফের দরস প্রদান করেন।

দীন পৌঁছানোর সবচেয়ে কার্যকর এবং ফলপ্রসূ পদ্ধতি হলো, ওয়াজ মাহফিল ও বয়ানের মাধ্যমে মানুষের কানে দীনের ফরযে আইন পরিমাণ ইলম পৌঁছানো। এতে সচেতন মুসলিম মাত্রই সব ধরনের কুসংস্কার ও বাতিল মতাদর্শের রাহমুক্ত হতে পারে এবং সুন্নতে নববীর অনুসরণে নিষ্কলুষ দীনের ধারক হতে পারে। অন্তত দীনহীন হৃদয়ে মুখলিস দা’ঈর সরল দিকনির্দেশনায় ঈমানের নূর জ্বলে ওঠে। এমনকি কখনো বক্তার অন্তর্দৃষ্টি বা প্রজ্ঞার প্রভাবে বক্র হৃদয়ের বদ্ধদুয়ারও নিমেষেই খুলে যায়।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. দরস-তাদরীসের অবসরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষত প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে দীনী প্রোগ্রাম এবং মাহফিলে অংশগ্রহণ করে থাকেন। এসব এলাকায় সফর হয় সাধারণত দরস বন্ধ থাকাকালীন দু’-তিন মাস পর পর। তবে দরস চলাকালীনও কখনো শুক্রবারগুলোতে প্রোগ্রামে গিয়ে থাকেন। এছাড়া নিয়মিত মোহাম্মদপুরস্থ জামি‘আতুল আবরার রাহমানিয়ায় দাওয়াতুল হকের ব্যানারে অনুষ্ঠেয় প্রতি মাসের আইম্মায়ে মাসাজিদ সম্মেলনে প্রধান আলোচক হিসেবে বয়ান করেন। তেমনি খিলগাঁও বাজার মসজিদে অনুষ্ঠেয় দাওয়াতুল হকের মাসিক জলসায়ও একই ভূমিকায় আলোচনা পেশ করেন। এছাড়া দাওয়াতুল হকের পাক্ষিক মাশওয়ারায়ও তিনি নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন। তার এ সকল আলোচনায় আশপাশের এলাকার দীনদার জনসাধারণ বিপুল আগ্রহে শরীক হয়ে থাকেন।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর বয়ানে সুরের বাহুল্য কিংবা কেচ্ছা-কাহিনীর রসালাপ থাকে না। হৃদয় তোলপাড় করা সুরের ঝঙ্কারে শে’র-আশ‘আরের আবৃত্তিও তিনি করেন না। তবে তাঁর বয়ানে থাকে দীন ও ঈমান সংশোধনের প্রেরণা, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের অনুশীলন, বিভ্রান্তি ও কুসংস্কারের অপনোদন এবং বিভিন্ন আমলী সুন্নতের বাস্তব প্রশিক্ষণ। আকায়েদ-ইবাদাত সহ দীনের মৌল পাঁচটি বিষয়ে বিন্যস্ত আলোচনায় তিনি উপস্থাপন করেন দীনের সারবত্তা। সে আলোচনা একাধারে বাতিলের মুন্ডুপাত করে, বিদ’আতের শেকড় উপড়ে মূল প্রসঙ্গে এগিয়ে যায়।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর বয়ানে যদিও সরস উপস্থাপনা থাকে না, তবু তাঁকে কেন্দ্র করে যেসব নিয়মিত প্রোগ্রাম হয় এগুলোতে বিপুল পরিমাণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমাগম ঘটে। তাদের কেউ চাকুরীজীবী, ব্যবসায়ী, কেউ প্রকৌশলী, আবার কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এসব প্রোগ্রামে নিয়মিত অংশগ্রহণকারীদের উত্তরোত্তর আত্মিক ও মানসিক প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। এমনও দেখা গেছে, দীনের প্রতি অনুরক্ত বন্ধুবান্ধবদের মধ্য থেকে যারা তাঁর বয়ানে নিয়মিত উপস্থিত হচ্ছেন তাদের মননশীলতার সাথে অন্যান্য বন্ধুদের বিস্তর ফারাক পরিলক্ষিত হয়েছে। ওয়াকিফহাল মহলের মতে, বক্তার আমল ও তাকওয়াই এই পরিবর্তনের মূল নিয়ামক। হযরতের বয়ানে নিয়মিত অংশগ্রহণকারীরা বলেন, তাঁর কথাগুলো অন্তরের গভীরে গিয়ে বিদ্ধ হয়। তাঁর কথায় যেন অন্যরকম প্রাণ থাকে। তিনি যে কথাই বলেন তার উপরই আমল এসে যায়। হযরতের অনুরাগী এই মহলের ধারণা, হযরত মুফতী সাহেব দা. বা. এর দু’টি বৈশিষ্ট্য এক্ষেত্রে তাঁকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দান করেছে। একটি হলো, সুন্নতের ওপরে তাঁর মযবুতী, আর অপরটি হলো গুনাহ বর্জন। যা অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে হয়তো পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান থাকে না।

হযরত মুফতী মনসূরুল হক সাহেব দা. বা. এর অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি পূর্বনির্ধারিত কোনো বিষয়ে বয়ান করেন না। বরং বয়ানের পূর্বমুহূর্তে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে যে বিষয়টির ইলহাম হয় সে বিষয়ে বয়ান করেন- চাই তা সময়ের প্রেক্ষাপটে হোক কিংবা কোনো প্রেক্ষাপট ছাড়া সাময়িক প্রয়োজনের তাগিদে হোক অথবা সুনির্দিষ্ট কোনো শ্রোতার মানসিক অবস্থার উপলক্ষেই হোক। মূলত এ ধরনের ইলহাম উপস্থিতির মানসিকতাকে কেন্দ্র করে হয়ে থাকে। ফলে কথাগুলো সকলের মনের গভীরে রেখাপাত করে।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর ইলহাম-সম্পর্কীয় এই গুণটির বহিঃপ্রকাশের ঘটনা বহুবার ঘটেছে। হযরতের গুণমুগ্ধ একজন নিয়মিত সফরসঙ্গীর ভাষ্য হলো, হযরতের প্রোগ্রামে কখনো কখনো বিকৃত চিন্তাধারা লালনকারী, ভ্রান্ত মতাদর্শের অনুসারী কিংবা বাতিল আকীদায় বিশ্বাসী মানুষের আগমন ঘটে। এরা কখনো পূর্ব-অবগতি দিয়ে আসে না। কখনো এমনও হয়, হযরতের আলোচনা পূর্ব থেকে কোনো একটি বিষয়ে চলতে থাকে। এমতাবস্থায় আকস্মিকভাবে পূর্বাপর আলোচনার সাথে একেবারেই সঙ্গতিহীন কোনো প্রসঙ্গে কথা শুরু করে দেন। অবস্থাদৃষ্টে ব্যাপারটি অন্যরকম মনে হলেও বয়ানের পরে দেখা যায়, সামঞ্জস্যহীন সেই কথাগুলোর মাধ্যমে ভিন্ন মতাদর্শী আগন্তুকের হিদায়াত হয়ে গেছে। এ থেকে বোঝা যায়, তিনি কাশফ ও ইলহামের অধিকারী।

কথায়-কাজে মিল থাকা এবং অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেয়ার গুণ এমন, যা সহজসাধ্য মনে হলেও অধিকাংশ মানুষের জন্য এর বাস্তবায়ন কল্পনাই বটে। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজেকে ন্যায়ের প্রতিভূ হিসেবে বিশ্বাস করেন, শরী‘আতের জীবন্ত নমুনা রূপে নিজেকে প্রকাশ করেন তার জন্য এটা সামান্য ব্যাপার। তার কাছে নিজের জীবনের চেয়ে দীনের মূল্য বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। শর‘ঈ বিধান লঙ্ঘিত হবার ভয়ে তিনি যদি কোনো আপনজনকে রুষ্ট করেন তাও অস্বাভাবিক নয়।

২০০৬ সালে সারাদেশের বহু মানুষ স্বচক্ষে ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখা সত্ত্বেও সরকারীভাবে পরবর্তী দিন ঈদ না হওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। এসময় আপোসহীনতার মূর্তপ্রতীক শাইখুল হাদীস হযরতুল আল্লাম মুফতী মনসূরুল হক সাহেব দা. বা. সকল কায়েমী স্বার্থের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পরবর্তী দিন ঈদ হওয়ার সাহসী ফাতাওয়া ঘোষণা করেন। সেদিন তিনি রাহমানিয়া মিলনায়তনে ঈদের নামায আদায় করেন।

এই ফাতাওয়ার কারণে তিনি প্রাণনাশসহ বিভিন্ন হুমকি-ধমকির সম্মুখীন হন। এমনকি একারণে তাঁকে খিলগাঁও শাহজাহানপুরস্থ আমতলা জামে মসজিদের খতীবের পদ থেকে অপসারণ করা হয়। তবু তিনি অন্যায়কে বিন্দুমাত্র বরদাশত করেননি। মসজিদ পরিচালনা কমিটির কাছে তিনি নিজের অবিচল অবস্থান ব্যক্ত করে বলেছিলেন, আমি এখানে নামায পড়াবো কি পড়াবো না- সেটা আপনারা সিদ্ধান্ত নিবেন। কিন্তু আমি যেখানেই থাকি না কেন, হক কথা বলেই যাবো। শরী‘আতের গন্ডির বাইরে আমি একটি কদমও উঠাবো না। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার ওপর যিম্মাদারী।

গত ২৮ শে রমাযান হযরতের বড় সাহেবযাদা মাওলানা আবু সাইদ রহ. পাকিস্তানে শিয়াদের হামলায় শহীদ হয়। হযরত ইচ্ছা করলে খুব সহজেই পুত্রের লাশ দেশে আনাতে পারতেন। কিন্তু শুধু আবেগের বশবর্তী হয়ে লাশ একস্থান থেকে অন্যস্থানে স্থানান্তর করা এবং জানাযা বিলম্বিত করা জায়েয নেই বিধায় তিনি তার পাকিস্তান প্রবাসী ভাইকে ফোনে বলে দিলেন ‘যত দ্রুত সম্ভব জানাযা ও কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করো।’ এখানেও তিনি আদরের সন্তানকে শেষ বারের মত দেখা এবং নিজে ছেলের জানাযার পড়ানোর আবেগের উপর শরী‘আতের হুকুমকেই প্রাধান্য দিলেন।

মোটকথা, হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর কাছে দীন এবং শরী‘আতের গুরুত্ব আপনজন এমনকি নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি। এ কারণে তিনি দীনের বিধান লঙ্ঘিত হওয়ার কারণে প্রাণপ্রিয় সন্তানের জানাযাও ত্যাগ করেছেন। কাজেই দীনের প্রশ্নে আপোসহীন এই ব্যক্তিত্ব ফাতাওয়া প্রদান এবং মাসআলা-মাসাইলের ক্ষেত্রে কতোটা দূরদর্শিতা এবং সতর্কতা অবলম্বন করবেন তা সহজেই অনুমেয়।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর ফাতাওয়াগুলো যারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন তাদের মতে, বাংলাভাষায় যারা ফাতাওয়া প্রদান করেন তাঁদের মধ্যে হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর অবস্থান অনন্য উচ্চতায়। খুঁটিনাটি বিষয়গুলোতে তাঁর বিশ্লেষণ একেবারে চুলচেরা। এমনকি তাঁর মাসআলা-মাসাইল বিষয়ক মজলিসের সাধারণ শ্রোতাগণও এমন সূক্ষ্মতর মাসাইল সম্পর্কে অবগত, যেগুলো বছরের পর বছর গবেষণা করার পরও বহু ফাতাওয়া-নবিসের আওতার বাইরে থেকে যায়। মূলত ফাতাওয়া প্রদানে অধিক সতর্কতা, স্পষ্টবাদিতা ও দূরদর্শিতার কারণে অন্যান্য বাংলাভাষী মুফতীদের তুলনায় তাঁর ফাতাওয়াগুলো অধিক বিশুদ্ধ এবং গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে।

জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়ার ফাতাওয়া বিভাগের মাধ্যমে হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর লিখিত ফাতাওয়া প্রকাশিত হয়। এছাড়া ফোনেও তিনি মাসআলা বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর দেন। যে কোনো বয়ানের পরে তাঁর কাছে প্রশ্ন করেও শর‘ঈ সমস্যার সমাধান জেনে নেয়া যায়। লিখিত ফাতাওয়া চাওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়মনীতি আছে। তবে মৌখিক মাসআলা জানার ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ বাধ্যবাধকতা নেই।

দীন সম্পর্কে বিস্তর জ্ঞানার্জনের জন্য ধর্মীয় বইপত্র এবং কিতাবাদির বিকল্প নেই। যারা দীন সম্পর্কে অজ্ঞ তাদের দাওয়াত কিংবা বয়ানের মাধ্যমে দীনের সাথে পরিচিত করে তোলা সম্ভব। কিন্তু শাখা-প্রশাখাগত জ্ঞান এবং খুঁটিনাটি তথ্যাদির জন্য বই-পুস্তকের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। তেমনিভাবে ভ্রান্ত মতবাদ এবং বিদ‘আত ও কুসংস্কারের মূলোৎপাটনেও বিশদ দলীল-প্রমাণের উপস্থাপন জরুরি। তাই অত্যধিক কর্মব্যস্ততার এ যুগে দীনের দা‘ঈগণ দাওয়াত এবং বয়ানের পাশাপাশি বইপত্র রচনায়ও মনযোগী হয়ে থাকেন।

যাপিত জীবনের প্রতিটি বাঁকে দীনের যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ইলম অর্জন করা ফরযে আইন, সে সব বিষয়েই হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. সাবলীল ভাষায় বিশ্লেষণী গ্রন্থাদি রচনা করেছেন। ঈমান-আকীদা, ইবাদত-বন্দেগী, সুন্নত-বিদ‘আত, মু‘আমালাত-মু‘আশারাত, বাতিল মতবাদসহ সব বিষয়েই তাঁর লিখনী নিরবিচ্ছিন্ন অবদান রেখে চলেছে। হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর সূক্ষ্মদৃষ্টি, নিগূঢ় বিশ্লেষণ এবং ভাষা ব্যবহারে সচেতনতার কারণে এসব বই-পুস্তকের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষিত দীনদার জনসাধারণ ব্যাপকভাবে উপকৃত হচ্ছেন।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. রচিত বই-পুস্তকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-কিতাবুল ঈমান, ফাতাওয়ায়ে রাহমানিয়া, ইসলামী যিন্দেগী, ‘আমালুস সুন্নাহ, কিতাবুস সুন্নাহ, ইশা‘আতুস সুন্নাহ, মাযহাব ও তাকলীদ, তুহফাতুল হাদীস, সন্তানের শ্রেষ্ঠ উপহার, ইসলামী বিবাহ, মালফুযাতে মুজাদ্দিদে দীন, নবীজীর সুন্নাত, মাসনূন দু‘আ ও দরূদ, নামায শিক্ষা, জীবনের শেষদিন, তাবলীগ কি ও কেন, সান্তনা ও পুরস্কার, সম্মিলিত মুনাজাত ইত্যাদি।

এছাড়াও হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. বিভিন্ন পত্রিকা-সাময়িকীতে প্রবন্ধ-নিবন্ধ এবং ধারাবাহিক কলাম লিখে থাকেন। বিভিন্ন সময়ে মাসিক হক পয়গাম ও মাসিক রাহমানী পয়গামে (প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ২০০১ ইং পর্যন্ত) মাসিক আদর্শ নারী, আল-আবরার, আল-জামি‘আ এবং দ্বিমাসিক রাবেতা’য় তাঁর বহু কলাম ও নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

শাইখুল হাদীস হযরতুল আল্লাম মুফতী মনসূরুল হক সাহেব দা. বা. হারদুঈর হযরত মুহিউস সুন্নাহ মুজাদ্দিদে-দীন মাওলানা শাহ আবরারুল হক রহ. এর জীবদ্দশায় তাঁর সাথে ইসলাহী সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি শাইখের অনুমতিপ্রাপ্ত হয়ে তাঁর হুকুমে মানুষের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের মেহনত শুরু করেন। তিনি হারদুঈর হযরত রহ. এর বাংলাদেশী শীর্ষস্থানীয় খলীফাদের অন্যতম।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. মূলত চিঠিপত্রের মাধ্যমে মানুষের আত্মিক রোগের চিকিৎসা করে থাকেন। তাঁর সাথে ইসলাহী সম্পর্কে আবদ্ধগণ প্রতি মাসে অন্তত একবার চিঠির মাধ্যমে নিজ অবস্থা সম্পর্কে অবগতি দিয়ে তাঁর কাছ থেকে ইসলাহী পরামর্শ লাভ করেন। এভাবে তিনি কুদৃষ্টি, ক্রোধ, হিংসা, লোভ, অহংকারসহ যাবতীয় আত্মিক রোগে ভুক্তভোগীদের রোগমুক্ত করে তাদেরকে আল্লাহওয়ালা বানানোর মহান খিদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন।

এ কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, এ যুগে ইসলাম এবং উম্মতে মুসলিমাহ’র অস্তিত্ব অনেকাংশেই দীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা কওমী মাদরাসা সমূহের উপর নির্ভরশীল। এই ধর্মীয় বিদ্যাপীঠগুলো মূলত পৃথিবীর বুকে দীন ইসলামের জন্য ‘পাওয়ার হাউজ’ স্বরূপ। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান তৈরির এই কর্মশালাগুলোই আজকের দিনে ভূপৃষ্ঠের যাবতীয় ন্যায়চিন্তা এবং উত্তম আদর্শের সূতিকাগার। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, দীনের রক্ষাকল্পে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা এবং এর রক্ষণাবেক্ষণই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর দীনী খিদমত।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. দীনের এই মহান খিদমত থেকেও পিছপা থাকেননি। বর্তমানে তিনি ঢাকার উত্তরা দারুল উলূম এবং মুন্সীগঞ্জ সদরের মাদরাসায়ে রাহমানিয়ার মুহতামিম। এ ছাড়া খুলনার পাইকগাছা ও কয়রা, ফরিদপুরের নগরকান্দা, সাতক্ষীরা, যশোর, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে নিজ উদ্যোগে কয়েকটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। আর ঢাকা, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, খুলনা, রংপুর, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলার প্রায় অর্ধশতাধিক মাদরাসা সরাসরি তাঁর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. একেবারেই নরম, ঠান্ডা মেজাজের মানুষ। ঘনিষ্ঠজনরা ব্যক্তিগত কারণে তাঁর রাগান্বিত হবার ঘটনা স্মরণ করতে পারেন না। আসলে তিনি খুব সহজে কারো সাথে রাগান্বিত হন না। আবার কারো প্রতি নারাজ হলেও মাফ চাইলেই ক্ষমা করে দেন, সেটা আর দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মনে রাখেন না। এ থেকে বোঝা যায়, উদারচিত্ত এ মানুষটির কোনরূপ ব্যক্তিগত অসহিষ্ণুতা নেই। তিনি কারো ওপর রাগান্বিত হলে সেটা তার ইসলাহ ও সংশোধনের জন্যই হয়ে থাকে। তাই মাফ চাওয়ার পর কারো প্রতি তাঁর অসন্তোষ বাকী থাকে না।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. ধৈর্য এবং সহনশীলতার মূর্তপ্রতীক। সহিষ্ণু এ মানুষটির নিত্যকার ওঠাবসা-চলাফেরায় প্রশান্তি যেন বিমূর্তরূপে ফুটে ওঠে। দু’একটি বিবরণীতে পাঠক তার কিছুটা অনুমান করতে পারবেন।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর প্রাণপ্রিয় জামি‘আ রাহমানিয়ার ভবন আক্রান্ত হবার দিন তিনি মাদরাসায়ই ছিলেন। যারা তাঁকে সেদিন দেখেছে তাদের মতে, সেদিন উদ্বেগ-আতঙ্কের কোনো চিহ্নই তাঁর মধ্যে ছিলো না। মনে হচ্ছিল, যেন তিনি এইমাত্র ঘুম থেকে উঠে এলেন। তদুপরি প্রাণপ্রিয় উস্তাদ শাইখুল হাদীস সাহেব রহ. থেকে যুক্তিসংগত কারণে বিচ্ছিন্ন হবার পর অনবরত নিন্দুকগোষ্ঠীর তীব্র বিষবাণে জর্জরিত হয়েছেন। পত্রপত্রিকায় তাঁর নামে আক্রমণাত্মক ভাষায় অসত্য অপবাদ ছাপানো হয়েছে। এমনকি এই অপপ্রচারের ফলে সারাদেশের সকল উলামায়ে কেরাম তাঁকে ভুল বুঝেছেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও দেশ-বিদেশ থেকে আসা শত-শত চাপ উপেক্ষা করে তিনি ন্যায় এবং হকের ওপর সর্বদা অবিচল ছিলেন।

গত ২৮শে রমজান হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর কলিজার টুকরা বড় পুত্র দুর্বৃত্তের প্রাণঘাতী বুলেটে শাহাদাত বরণ করেন। পুত্রশোকের জগদ্দল পাথর বুকে নিয়েও তিনি ছিলেন ধৈর্যের অটল পর্বততুল্য। এ সময়টিতে মুনাজাতে তাঁর কণ্ঠে আবেগের একটু কম্পনও অনুভূত হয়নি। নির্বিকার কণ্ঠে শুধু এটুকুই বলে গেছেন, ‘আল্লাহ! তুমি যে আমার সন্তানটাকে নিয়ে গেছো এতে আমার কোনো অভিযোগ নেই’। উপরন্তু এই ট্রাজেডির মাত্র ৪-৫ দিন পরই পূর্বনির্ধারিত খুলনা-সাতক্ষীরা জেলার দীর্ঘ সফরে রওনা হন। পুত্রশোকের অজুহাতে এই সফরে তিনি পূর্বনির্ধারিত কোনো সূচিতে সামান্যও পরিবর্তন করেননি। এমনকি এই সফরের সূচিতে পরিবর্তন আনার অনুরোধ করা হলে তিনি বলেছিলেন, এভাবে একের পর এক হালাত এবং অবস্থার পরিবর্তন হতেই থাকবে। কিন্তু এর কারণে দীনের কাজ বন্ধ করা যাবে না।

আমল যেমন ইখলাস ছাড়া নিষ্ফল ও অগ্রহণীয়, তেমনি ইখলাসবিহীন দাওয়াতও প্রভাবহীন, অকার্যকর। স্বয়ং দা‘ঈর অন্তর ইখলাসশূন্য হলে তার দাওয়াত দ্বারা শ্রোতার জীবনে পরিবর্তন সাধিত হয় না। পক্ষান্তরে যে দা‘ঈ প্রতি কদমে লিল্লাহিয়াতের অনুশীলন করেন, প্রতিটি আমলে ইখলাসের মুহাসাবা করেন তাঁর কথার প্রভাবে অহর্নিশ মানুষের ঈমান-আমলে উন্নতি ও পরিশুদ্ধি সাধিত হওয়া বিস্ময়কর নয়। তাঁর লিখনীতে সমাজের পরিবেশ ও সংস্কৃতি নূরান্বিত হওয়াই স্বাভাবিক।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. দেশের বিভিন্ন স্থানে মাহফিলে অংশগ্রহণের জন্য সফর করে থাকেন। এসব মাহফিলে বয়ান করার জন্য তাঁকে দাওয়াত দেয়ার প্রধানতম শর্তই হলো, বয়ানের জন্য তাঁকে কোনো হাদিয়া দেয়া যাবে না। কোনো প্রকার হাদিয়া প্রদান না করার উক্ত শর্ত আরোপ করা প্রসঙ্গে হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. বলেন, চুক্তিবিহীন হাদিয়া গ্রহণ করা জায়েয হলেও তা চুক্তিবদ্ধ হাদিয়ার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তিনি এ ক্ষেত্রে স্বীয় শায়খ হারদুঈর হযরত রহ. এর কথা বর্ণনা করেন। তিনি বলতেন, তোমরা বয়ান এবং ওয়াজ মাহফিল থেকে টাকা-পয়সা নিও না। এতে এই নবীওয়ালা কাজে কথার ‘আসর’ বা প্রভাব থাকে না। শাইখের এই কথার কারণে তিনি মাহফিলের সফরে গাড়ির ভাড়া ছাড়া কোনো টাকা-পয়সা নেন না। বরং কখনো এমনও দেখা গেছে, বিভিন্ন মাদরাসার তহবিলে নিজের পকেট থেকে টাকা-পয়সা দান করে এসেছেন।

কিছুদিন আগে হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. জুরাইন এলাকায় একটা মাহফিলে অংশগ্রহণ করেন। অনেক জোরাজুরি করা সত্ত্বেও উক্ত মাহফিলের আয়োজকগণ তাঁকে হাদিয়া দিতে পারেননি। শুধু তাঁর অনুপস্থিতিতে ড্রাইভারকে যাতায়াত খরচ দিতে পেরেছিলেন, যা সাধারণ ভাড়ার চেয়ে কিছুটা বেশি ছিলো। হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. গাড়িতে ওঠার পর যখন বিষয়টা জানতে পারলেন, তখন ড্রাইভারকে বলে অতিরিক্ত পরিমাণটাও ফেরত দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে হযরতের শাগরেদ ও সফরসঙ্গী মাওলানা জালীস মাহমুদ বলেন, এই নির্মোহ মানুষটির নজির পাওয়া আজ দুষ্কর, যিনি বয়ানের কোনো হাদিয়া নেয়া তো দূরের কথা, এমনকি গাড়িভাড়ার অজুহাতেও অতিরিক্ত পয়সা নেন না; যদিও তা ড্রাইভারকেই দেয়া হয়।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. যেমনিভাবে বয়ানের কোনো হাদিয়া গ্রহণ করেন না তেমনিভাবে তাঁর লিখিত বইগুলোর লভ্যাংশও নিজে ভোগ করেন না। এগুলোর অধিকাংশেরই স্বত্ব বা রয়্যালিটি নিজের নামে রাখলেও তার লভ্যাংশের মালিকানা জামি‘আ রাহমানিয়ার নামে দিয়ে রেখেছেন। হযরতের ঘনিষ্ঠজনদের বক্তব্য মতে, বর্তমানে তিনি শুধু এই লভ্যাংশের সংরক্ষণ করছেন। রাহমানিয়ার প্রয়োজন উপলব্ধি করা মাত্রই তিনি এটা রাহমানিয়া কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করবেন।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর স্বতন্ত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সন্ধান করলে সবার আগে তাঁর যে গুণটি পরিস্ফুট হয়ে ওঠে তা হলো ন্যায়ের প্রশ্নে তাঁর আপোসহীনতা। তিনি যে কোনো সময় যে কারো কোনো ত্রুটি দেখলে সমালোচনার কোনো পরোয়া না করে তৎক্ষণাৎ সংশোধন করে দেন। ফলে এরপর কখনো সংশোধিত ব্যক্তি পুনর্বার উক্ত ভুলের সম্মুখীন হতে লাগলেই হযরতের স্নেহমাখা কণ্ঠ তার কানে প্রতিধ্বনিত হয়। এ ব্যাপারে হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর ভাষ্য হলো, সমালোচনার ভয়ে সবাই যদি গা-বাঁচিয়ে চলে তাহলে মানুষের ন্যায়-অন্যায় চেনার জায়গাই থাকবে না। এজন্য কিছু লোককে সব সময় ন্যায়ের ব্যাপারে সরব থাকতে হবে, যাতে মানুষ সত্যের দিশা পেতে পারে।

হযরতের আপোসহীনতার এই গুণটি সম্পর্কে তাঁর সুযোগ্য ছাত্র মাওলানা শফীক সালমান কাশিয়ানী একটি বিস্ময়কর ঘটনা শুনিয়েছেন। বিগত বছর একবার হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. তাঁর শ্বশুরালয়ে মাসনা মাদরাসার শূরার মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করেন। মাশওয়ারা মাগরিবের পর শুরু হয়ে এশার সময় সমাপ্ত হয়। ইতোমধ্যে সংবাদ আসে, হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর সম্বন্ধী হাফেজ ইসহাক সাহেব ইন্তেকাল করেছেন। জানাযার সময় নির্ধারিত হলো পরদিন বা’দ ফজর। অথচ পরদিন বা’দ ফজর যশোর রেলগেট মসজিদে হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর প্রোগ্রাম পূর্ব থেকেই নির্ধারিত ছিলো। তাই তিনি এই প্রোগ্রামের ওয়াদা রক্ষার্থে কোনো সমালোচনার তোয়াক্কা না করে একনজর লাশ দেখেই চলে আসেন। মূলত এ জানাযায় শরীক হলে পূর্বনির্ধারিত প্রোগ্রামটিতে অংশগ্রহণকারী শ্রোতাদের কাছে তিনি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দোষে দুষ্ট হতেন। এদিকে আত্মীয়তা রক্ষা করতে গেলে ওদিকে আলেমসমাজের মর্যাদাক্ষুণ্য হতো। এ ধরনের বড় বড় ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য তিনি শ্বশুরালয়ে সম্বন্ধীর জানাযা রেখেই চলে এসেছিলেন। এমনকি কোনো সমালোচনা কিংবা মনোমালিন্যের পরোয়াই করেননি। উপরন্তু এ প্রসঙ্গে মাওলানা কাশিয়ানীর কথার জবাবে বলেছিলেন, “শরী‘আত কিছু উসূলের নাম। আবেগের নাম শরী‘আত নয়।”

দীনী দাওয়াতের পথ বৈরিতা কিংবা প্রতিকূলতা মুক্ত নয়। দীনের পতাকাবাহী দা‘ঈগণের মোকাবেলায় সর্বযুগেই একদল প্রবঞ্চক হকের আবরণে বাতিলের দাওয়াত দিয়ে গেছে। এ কারণেই সব যুগে দীনের দা‘ঈগণ হকের দাওয়াত পৌঁছানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে বাতিলের ব্যাপারে অবিরাম সতর্ক করে গেছেন। পূর্বযুগের ধারাবাহিকতায় এ যুগেও বাতিলের ধ্বজাধারীরা সকল পথ ও পন্থা ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট করার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. দীনের দাওয়াত পৌঁছানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সমসাময়িক সব বাতিল মতবাদের ব্যাপারে সচেতন করে থাকেন। শিয়া মতবাদ, মওদূদী ফেতনা, কাদিয়ানী মতবাদ, লা-মাযহাবিয়াতসহ কোনো ভ্রান্ত মতবাদই তাঁর বলিষ্ঠ আঘাত থেকে নিস্তার পায় না। সব বাতিল মতবাদের উপরেই তিনি অকাট্য, প্রামাণ্য এবং বিশ্লেষণী আলোচনা উপস্থাপন করেন। বাতিল যত শক্তিশালী এবং ক্ষমতাধরই হোক তিনি নির্ভীকচিত্তে, বলিষ্ঠকণ্ঠে তাদের ভ্রান্তি ও প্রতারণাগুলো সুস্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেন। বাতিল প্রসঙ্গে তাঁর বিশ্লেষণপূর্ণ কথাগুলো এতটাই সহজবোধ্য এবং প্রাঞ্জল হয় যে, রিক্তহস্ত সাধারণ মানুষের জন্য তার একেকটি কথা বাতিলের বিরুদ্ধে বড় বড় হাতিয়াররূপে হস্তগত হয়।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর সব বয়ানে সাধারণত প্রাসঙ্গিকভাবে বাতিলের আলোচনা চলে আসে। এভাবে প্রসঙ্গক্রমে বাতিলের আলোচনায় তিনি কিছুটা বিশ্লেষণও করেন। এতে উপস্থিত শ্রোতাগণ বাতিল সম্পর্কে ছোট কিন্তু শক্ত কিছু কথা পেয়ে যান। এছাড়াও হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. সরাসরি সুনির্দিষ্ট বাতিল মতবাদ বিষয়ক সেমিনারেও অংশগ্রহণ করে থাকেন। ইতোমধ্যে তিনি ঢাকার বসুন্ধরা, কাঁচপুর এবং বগুড়া, মানিকগঞ্জ, ভৈরবসহ বিভিন্ন জেলার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রামে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বিশ্লেষণী আলোচনা করেছেন। এগুলোর কোনো কোনো আলোচনা ধারণকৃত অবস্থায় সিডি আকারে পরিবেশিতও হয়েছে।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর প্রত্যেক বয়ানেই সুন্নতে নববী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে আলোচনায় আসে। বিশেষত নামাযের বিভিন্ন সুন্নত তিনি নিজে হাতে-কলমে দেখিয়ে দেন। এমনকি কখনো একজনকে মঞ্চেই দাঁড় করিয়ে তার মাধ্যমে নামাযের বিভিন্ন ভুল দেখিয়ে সহীহ তরীকাও উপস্থাপন করেন। একারণে হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর বয়ান থেকে সকলে সুন্নতে নববীর দাওয়াত লাভের সাথে সুন্নতের ওপর আমলের বাস্তব প্রশিক্ষণও লাভ করেন।

শুধু শিক্ষাদানই নয়; হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. প্রাত্যহিক সব কাজ-কর্মে সুন্নতে নববীর একনিষ্ঠ অনুসরণ করেন। খাওয়া-দাওয়া, ঘুমানো, পোশাকাদি পরিধান করাসহ প্রতিটি উঠাবসায় সুন্নতের প্রতি তাঁর আন্তরিক টান প্রত্যেক অনুরক্তকেই অভিভূত করে। সুন্নতের গন্ডির বাইরে তাঁর একটা কদমও যায় না। তাঁর সংস্পর্শে এসে যে কেউ অতি সহজেই নিজের জীবনকে সুন্নতের ছাঁচে ঢেলে সাজাতে পারে। এ প্রসঙ্গে ওয়াকিফহাল মহলের মন্তব্য হলো, সুন্নতের ওপর তাঁর সার্বক্ষণিক আমল এবং মজবুতী আছে বলেই পাঠক ও শ্রোতাদের মাঝে তাঁর সুন্নতের দাওয়াত অসামান্য প্রভাব ফেলে থাকে।

মাওলানা ফখরুদ্দীন সাহেব

মুহতামিম : জামিআতুল আবরার ঘিওর, মানিকগঞ্জ।       

০১৭২০৯১৯১২৮
মাওলানা জহুরুল হক সাহেব

মুহতামিম : জামিআ আরাবিয়া, পুড্ডা, ফরিদপুর।  

০১৭১৮০৪১২৮৮
মুফতী হাসান সিদ্দীকুর রহমান সাহেব

মুদাররিস : জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়া, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

০১৭১২৮১৮৩৪৮
মুফতী রিজওয়ানুর রহমান সাহেব

মুদাররিস : জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়া, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

০১৮১৮৪০০৯১৮
মাওলানা মুফীজুল ইসলাম সাহেব

মুহাদ্দিস : জামিআতুস সুন্নাহ, শিবচর, মাদারীপুর।

০১৮৬০৭৬৫২১৩
মুফতী হিদায়াতুল্লাহ সাহেব

মুহাদ্দিস : জামিআতুস সুন্নাহ, শিবচর, মাদারীপুর।

০১৭৩৩২৬৮৫৮৩
মুফতী মুশাররফ হুসাইন সাহেব

মুহতামিম : কাসিমিয়া দারুল উলূম, সারদাগঞ্জ, গাজীপুর।   

০১৯১৭০৩৮৩২১
মুফতী মুসলিহুদ্দীন রুমী সাহেব

নায়েবে মুহতামিম : দারুল উলূম, ঢাকা।     

০১৬৭১৬৪৫৫০৬
মুফতী আখতারুজ্জামান সাহেব

মুহাদ্দিস : জামিআ কুরআনিয়া, বকচর, যশোর।    

০১৯১৭২৯৩৭৯৬
১০ মুফতী শফীকুর রহমান সাহেব

মুদাররিস : জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়া, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

০১৮১২৪৬৪৩৬২
১১ মাওলানা তাজুল ইসলাম সাহেব

নায়েবে মুহতামিম : জামিআতুস সুন্নাহ, ঘিওর, মানিকগঞ্জ। 

০১৬৮৭৬৪৩৯৬১

 

১২ মাওলানা ওয়ালীউল্লাহ সাহেব

ইমাম ও খতীব : ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, সন্তোষ, টাঙ্গাইল

০১৭১১০৩৪৬২৯

 

১৩ মুফতী সিদ্দীকুর রহমান সাহেব

মুদাররিস ও নাযেমে দারুল ইকামা : জামিআ মাহমুদিয়া, দেশীপাড়া, গাজীপুর মহানগর।  

০১৯৩২৯৮৫৮৩২

 

১৪ মুফতী সাঈদুর রহমান সাহেব

মুহাদ্দিস : দারুল উলূম ঢাকা, মক্কীনগর, বান্দাখোলা, কালিগঞ্জ, গাজীপুর।

০১৬১৩২২২৩২৭
১৫ মুফতী আবুল বাশার সাহেব

মুদাররিস : জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়া, মৃধাবাড়ী, দেওভোগ মুন্সীগঞ্জ।      

০১৯২১২২৬৭৮৭

 

১৬ মুফতী তাফাজ্জুল হুসাইন সাহেব

নায়েবে মুহতামিম ও শিক্ষাসচিব : আল জামিআ মাদীনাতুল উলূম সিকদার মেডিক্যাল, রায়েরবাজার, ঢাকা।

০১৭১২৪৬২৭৪৬
১৭ মুফতী জহীরুল ইসলাম সাহেব

সিনিয়র মুহাদ্দিস ও প্রধান মুফতী : জামিআ ইসলামিয়া বাইতুন নূর, সায়েদাবাদ, ঢাকা।

০১৯১৮৬৫৯২৫৬
১৮ মুফতী রাশেদ ইকবাল সাহেব

মুহাদ্দিস : জামিআ ইলয়াসিয়া ইসলামিয়া, বৌবাজার, হাজারীবাগ, ঢাকা 

০১৯২৩১৩৬৮২০
১৯ মুফতী নূর মুহাম্মদ সাহেব

প্রধান মুফতী : উমর ইবন খাত্তাব রা. মাদরাসা, খাস সাতবাড়িয়া, শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ ।       

০১৭১৯৫৩৯৪৫৬
২০ মুফতী সাঈদ আহমদ সাহেব

নায়েবে মুফতী : জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়া, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

০১৮১৮০৭০৩৪৩

www.darsemansoor.com

অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে গতিশীল বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে দীনের দা‘ঈগণের জন্য অনলাইনে অংশগ্রহণও অপরিহার্য হয়ে দেখা দিয়েছে। সীমাহীন কর্মব্যস্ততার এ যামানায় শহুরে মানুষের জন্য বাড়ির পাশে মাদরাসার মাহফিলে শরীক হওয়া কিংবা লাইব্রেরী থেকে দু’টো বই খরিদ করে টেবিলে রাখা ক্লান্তিকর। বরং হাতের আইপ্যাড বা ট্যাবে কিছু বাটন চেপে সুনির্দিষ্ট লিংকে প্রবেশ করা মানুষের জন্য অনেক বেশি সহজ এবং স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ। তাই দীনের দা‘ঈগণ সামাজিকভাবে জনপ্রিয় ইন্টারনেট-মাধ্যমকেও দীনের খিদমতে ব্যবহার করছেন।

সেই ধারাবাহিকতায় হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এই মিডিয়ায়ও জোরকদমে এগিয়ে এসেছেন। ‘দারসে মানসূর’  নামে ওয়েবসাইট গড়ে তুলে অন্তর্জালে ছড়িয়ে দিচ্ছেন তিনি হেদায়াতের আলোকবার্তা। কর্মব্যস্ত মানুষের সহজলভ্য এই জ্ঞানমাধ্যমে অংশগ্রহণ তাঁকে দীনপিপাসী জনসাধারণের আরো নিকটতর করেছে। তাঁর খিদমতের পরিধি বেড়ে দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের প্রবাসী বাংলাভাষীদেরও উপকৃত করছে।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর প্রতি জুমু‘আর বয়ান এই ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়। এমনিভাবে জুমু‘আর বয়ান ছাড়াও অন্যান্য প্রোগ্রামের বয়ানও এখানে দেয়া হয়। বয়ান হওয়ার পর পরই ওয়েবপেজে তা পাওয়া যায়। তারিখ ভিত্তিক বয়ানের বিন্যাস ছাড়াও এখানে বিষয়ভিত্তিক বয়ানের বিশাল সংগ্রহ আছে। কোনো সুনির্দিষ্ট বিষয়ে হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর বয়ান পেতে চাইলে এখান থেকে শোনার এবং ডাউনলোড করারও ব্যবস্থা আছে।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. এর অধিকাংশ বইয়ের পিডিএফ কপিও এখানে সংরক্ষিত আছে। এগুলোর জন্যও ওয়েবপেজ থেকে সরাসরি পড়া এবং ডাউনলোড করা- উভয় অপশনই আছে। এছাড়া কোনো মাসআলা জানতে চাইলে কিংবা দীনী পরামর্শ পেতে চাইলে তার জন্যও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে এবং ই-মেইল অ্যাড্রেসও দেয়া আছে।

সূর্যের চোখ ধাঁধানো কিরণ যে দেখেনি তাকে সূর্যালোকের বিবরণ দেয়া অনর্থক। রজনীগন্ধার সুবাস যে শোঁকেনি তার কাছে রজনীগন্ধার বিবরণ মূল্যহীন। কোনো বর্ণনাই বাস্তবতার চিত্রায়ক হতে পারে না। দীন ও ঈমানের দিবাকর হযরত মুফতী সাহেব দা. বা. এর কর্ম ও পরিচয় এবং গুণ ও বৈশিষ্ট্যের যত মর্মস্পর্শী ও বিশ্লেষণধর্মী বিবরণই উপস্থাপন করা হোক, তাঁর পরিচিত মহলের কাছেই তা অসম্পূর্ণ থাকবে। তাঁর পরিচয় প্রত্যাশীদের আশাও যে নিরাশায় পর্যবসিত হবে- সেটা বলাই বাহুল্য। তবু মূলত সূর্যের পূর্ণপরিচয় সূর্যালোকই দিতে পারে। ফুলের সুবাসই হতে পারে ফুলের বড় পরিচয়। হযরতুল আল্লাম মুফতী মনসূরুল হক সাহেব দা. বা. কে জানতে হলে তাঁর সান্নিধ্যেই আসতে হবে। তাঁর পরিচয় পেতে হলে তাঁর কর্মের ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

হযরতওয়ালার সনদ

বুখারীর সনদ

সনদ বা বর্ণনা সূত্র মানে আমরা যেই হাদীস বলি সেই হাদীসের বর্ণনাসূত্র হুজুর ﷺ পর্যন্ত থাকা । অর্থাৎ এখন যিনি হাদীস বর্ণনা করছেন তার থেকে নিয়ে কার কার মাধ্যমে নবীজি ﷺ পর্যন্ত পৌছেছে। আমাদের (হযরতওয়ালা মুফতী মনসূরুল হক দা.বা) থেকে নিয়ে কমপক্ষে ২৭/২৮ জনের পরেই আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ ﷺ নাম আসে। এই নামের তালিকায় যারা আছেন তাঁদের প্রত্যেকের জীবনী লিখা হয়েছে। আর জীবনী কোন একজন ব্যক্তি লিখেন নাই বরং বহু আল্লাহর অলী, আলেমগণ লিখেছেন। তাঁর জন্ম,মৃত্যু,কোন কোন উস্তাদের নিকট ইলম হাসীল করেছেন, কোন এলাকায় বসবাস করতেন, তাঁর তাকওয়া-পরহেজগারী ইত্যাদি প্রায় সব লিখা হয়েছে। যে কেউ যে কারো ব্যপারে জানতে চাইবে সে তা পাবে। আসমাউর রিজাল থেকে তা জানিয়ে দেয়া যাবে যে এই হাদীস বর্ণনাকারী কেমন ছিলেন। সাধারণতঃ মানুষ তাদের ছেলে-মেয়ের বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ের ব্যপারে কত চৌকসের সাথে সব খবর নিয়ে থাকে। যারা এই সকল হাদীস বর্ণনাকারীদের জীবনী লিখেছেন তারা এর চেয়েও বহু গুনে বেশী সচেতনতার সাথে হাদীস বর্ণনাকারীদের ব্যপারে জেনে তা রচনা করেছেন।

ইতিহাস জানা জরুরী না কিন্তু আসমাউর রিজাল যে ইতিহাস তা জানা ফরজে কিফায়া। কেননা এর উপর নির্ভর করেই হাদীস সংগ্রহ করা হয়েছে। এই ইতিহাস সংরক্ষন করতে হবে। এক জামাতের জন্য জরুরী। তা না হলে ইসলামের বিভিন্ন নামধারীরা ইসলামের ক্ষতি খুব সহজে করবে। আমাদের আকাবিররা বলেন, যাদের নিকট থেকে হাদীস সংগ্রহ করা হয়েছে তাঁরা প্রত্যেকে আল্লাহওয়ালা। প্রত্যেকে একেকটা নূরের ক্ষুটি।

এই সনদ এই উম্মতের একটা বৈশির্ষ্ট্য। এই উম্মত প্রত্যেকটা হাদীসের ব্যপারে বলতে পারবে কার কার মাধ্যমে হাদীসটা আল্লাহর রাসূল ﷺ পর্যন্ত পৌঁছেছে। অন্য কোন ধর্মের লোক তাদের একটা কথাও তাদের নবী পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে না। আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে এর মূল্য বুঝার তোফিক দান করেন। আমীন।

ইসলাহী সনদ

অন্তরের ১০টি রোগের চিকিৎসা করে অন্তরের ১০টি গুণ হাসিল করার নাম তাযকিয়া বা আত্মশুদ্ধি। যা শরী‘আতের দৃষ্টিতে ফরযে আইন এবং এর জন্যে কোন ইজাযত প্রাপ্ত শাইখের সাথে ইসলাহী সম্পর্ক করাও ফরযে আইন। বাইআত হওয়া ফরয বা ওয়াজিব নয় বরং এটা মুস্তাহাব, এর উপর আত্মশুদ্ধি নির্ভর করে না। আত্মশুদ্ধি অর্জন হলে সমস্ত জাহেরী গুনাহ বর্জন করা এবং জাহেরী ইবাদত-বন্দেগী করা সহজ হয়ে যায় এবং সেই বন্দেগীকে তাকওয়ার যিন্দেগী বা সুন্নতী যিন্দেগী বলে এবং সে ব্যক্তি তখন আল্লাহর ওলী হয় এবং তার হায়াতে তাইয়িবা তথা পবিত্র জীবন নসীব হয়। আল্লাহ তা‘আলা সকলকে এ দৌলত নসীব করেন, আমীন।

শায়খুল হাদীস হযরতুল আল্লাম মুফতী মনসূরুল হক সাহেব দা. বা. হারদুয়ীর হযরত মুহিউসসুন্নাহ মুজাদ্দিদে-দীন মাওলানা শাহ আবরারুল হক রহ. এর জীবদ্দশায় তাঁর সাথে ইসলাহী সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি শায়খের অনুমতিপ্রাপ্ত হয়ে তাঁর হুকুমে মানুষের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক ঊৎকর্ষের মেহনত শুরু করেন। তিনি হারদুয়ীর হযরত রহ. এর বাংলাদেশী শীর্ষস্থানীয় খলীফাদের অন্যতম।

হযরত মুফতী সাহেব দা.বা. মূলত চিঠিপত্রের মাধ্যমে মানুষের আত্মিক রোগের চিকিৎসা করে থাকেন। তাঁর সাথে ইসলাহী সম্পর্কে আবদ্ধগণ প্রতি মাসে অন্তত একবার চিঠির মাধ্যমে নিজ অবস্থা সম্পর্কে অবগতি দিয়ে তাঁর কাছ থেকে ইসলাহী পরামর্শ লাভ করেন। এভাবে তিনি কুদৃষ্টি, ক্রোধ, হিংসা, লোভ, অহংকারসহ যাবতীয় আত্মিক রোগে ভুক্তভোগীদের রোগমুক্ত করে তাদেরকে আল্লাহওয়ালা বানানোর মহান খিদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন।

 

 

.

হযরতওয়ালাকে মাহফিলে দাওয়াত দেয়ার উসুল

১. বয়ানের আয়োজন মাদরাসা বা মসজিদ কেন্দ্রিক করা। (দাওয়াতুল হকের মাহফিল খোলা মাঠে তেমন ফলপ্রসু হয় না।)

২. দাওয়াতের তারিখ ডায়রীতে লেখানো এবং পরে তা নিশ্চিত করা। চাই তা স্ব-শরীরে যেয়ে হোক বা মোবাইল দিয়ে।

৩. রাস্তা বা মানুষ যাতায়াতের বিঘ্ন সৃষ্টি করে এমন যায়গায় মাহফিলের আয়োজন না করা।

৪. মাইক এর আওয়াজ মাহফিলের আওতাভুক্ত করা। দূরে মাইক না দেয়া।

৫. বাদ মাগরিব অথবা যথা সময়ে ইশার নামাজ আদায় করে সর্বোচ্চ ৩০ মিনিটের মধ্যে বয়ানের ব্যবস্থা করা।

৬. টিভির কোন বক্তাকে উক্ত মাহফিলে দাওয়াত না দেয়া।

হযরতওয়ালাকে ইসলাহী চিঠি দেয়ার নিয়ম

১। একদম উপরে বিসমিহী তা‘আলা।

২। সালাম লিখার পর বিষয়বস্তু শুরু করবে।

৩। কাগজের মধ্যে লম্বা ভাবে মাঝখানে ভাজ করবে, তার পর ডান অর্ধেকে লিখবে এবং বাম অর্ধেকে জবাবের জন্য খালি রাখবে।

৪। ইসলাহী সম্পর্ক কায়েম এর এজাযত না নিয়ে ইসলাহী চিঠি লিখবে না।

৫। প্রত্যেক চিঠির উপরে বিস্‌মিহী তা‘আলার নীচে চিঠি নং……….. লিখবে।

৬। চিঠি খামের ভিতরে দিবে, খামের উপর শুধু নিজের নাম ও ঠিকানা লিখবে (এটা হাতে হাতে নেয়ার ক্ষেত্রে)।

৭। প্রত্যেক চিঠির সাথে আগের চিঠির ফটোকপিও দিয়ে দিবে।